logo

রাজধানী

মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিওর সফর নিয়ে কূটনীতিতে নয়া সমীকরণ

ঢাকার নতুন কূটনৈতিক পথচলা পর্যবেক্ষণ করতে চায় ওয়াশিংটন; সে লক্ষ্যে মার্কিন বিশেষ দূত ও ভারতের নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের আসন্ন সফর ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কূটনৈতিক মহলে চলছে নানান সমীকরণ।

মুহাম্মদ নূরে আলম
Printed Edition

মুহাম্মদ নূরে আলম

ঢাকার নতুন কূটনৈতিক পথচলা পর্যবেক্ষণ করতে চায় ওয়াশিংটন; সে লক্ষ্যে মার্কিন বিশেষ দূত ও ভারতের নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের আসন্ন সফর ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কূটনৈতিক মহলে চলছে নানান সমীকরণ। বিশ্বরাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীলতার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দিকনির্দেশনা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সাম্প্রতিক যোগাযোগের গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ দূত সার্জিও গোর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর আগামী ২৮ ও ২৯ জুলাই দুদিনের কূটনৈতিক সফরে ঢাকায় পৌঁছাবেন বলে খসড়া সূচি প্রস্তুত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এই তথ্য জানাযায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এই বিশেষ প্রতিনিধির সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক মহল। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্ব বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পন্ন করেছেন। আগামী আগস্ট মাসে তার জাপান এবং অক্টোবর মাসে তুরস্ক সফরের কথা রয়েছে। অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত পাঁচ মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্ক, বেলজিয়াম, ইথিওপিয়া, ভারত, চীন এবং রাশিয়া সফর করেছেন। এসব সফরের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন মেরুকরণ বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

সূত্রে জানাযায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্য সাধারণ বা রুটিন সফরের চেয়ে রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সফরটি বেশ ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রশাসনের যেকোনো বিশেষ দূতের সফরের নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য বা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। সার্জিও গোরের মূল উদ্দেশ্য হলো; বাংলাদেশের নতুন সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি আসলে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং সামনের দিনগুলোতে ঢাকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে পা ফেলতে চায় তা সরাসরি জানা ও বোঝা।

মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধির সফর নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময়ই ভালো আছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও বেশি জোরদার হচ্ছে এবং হবে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ডেলিগেশন বা যেকোনো হাই-লেভেল সফর যখন হয়, তখন আমরা মনে করি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে তা আরও গভীর করে। আমরা আশা করি, এই সফরের মাধ্যমে আরও নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে। আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে, সেগুলো আরও সুগম হবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি (অর্থনৈতিক কূটনীতি) কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটাই আলোচিত হবে বলে আমি মনে করি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও আমেরিকার স্টেট ইউনির্ভাসিটির নিউইয়র্ক সহযোগী অধ্যাপক ড. ইমরান আনসারী বলেন, ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে তাদের সামরিক কাঠামোর আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তিতে সই করানোর জন্য তাগিদ দিয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশ ২০১৯ সাল থেকে কৌশলগতভাবে আলোচনার টেবিলে সময়ক্ষেপণ করছে। একইভাবে, চীন তাদের বৈশ্বিক সিকিউরিটি বা ডেভলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই, জিএসআই, জিসিআই, জিজিআই) আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিলেও ঢাকা কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক; সবাই এখন বুঝতে পারছেন যে, একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজের জাতীয় স্বার্থ হাসিল করাই এখন ঢাকার মূল পররাষ্ট্র কৌশল।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের এই দুদিনের ঢাকা সফর শুধুই একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্কের আগামী দশকের সমীকরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আমলের পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের এই নতুন অবস্থান এবং সবার সাথে বন্ধুত্বের ভারসাম্যপূর্ণ চর্চাকে ওয়াশিংটন কীভাবে গ্রহণ করে, তা সার্জিও গোরের সফর শেষে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠবে। তবে এ কথা স্পষ্ট যে, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে না দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এই নতুন প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাচ্ছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ।

কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওয়াশিংটন মূলত জানতে চায়; বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোন কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে? চীনের সাথে ঢাকার সাম্প্রতিক বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সমঝোতাগুলো কত দূর গড়াচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও বৈশ্বিক কাঠামোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে? বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। একই সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও (আইপিএস) বাংলাদেশের অবস্থান বেশ স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঢাকার নতুন পথচলা ঠিক কোথায় গিয়ে থামছে, তা মার্কিন প্রশাসনের জন্য গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি হয়ে পড়েছে; বিশেষ করে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকালে দুটি বড় প্রস্তাব বা চুক্তি আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্যাপক নজর কেড়েছে। ১. চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ট্রানজিট ও করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব। ২. পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে উভয় দেশের মধ্যে ‘২+২ বৈঠক’ আয়োজনে একমত হওয়া। তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরকালে পুনরায় ‘এক-চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, চীন তা র পুনরেকত্রীকরণের উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশ তাতে সমর্থন জোগাবে। পাশাপাশি, চীন সরকারের উত্থাপিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগের (জিজিআই, জিডিআই, জিএসআই এবং জিসিআই) প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ।

অন্যদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত জুন মাসে ঢাকা সফর করার সময় দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির উন্নয়নে যৌথ কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছেন। একই সাথে তুরস্কের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বগুড়ায় অত্যাধুনিক ড্রোন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রশাসনিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ২৮ ও ২৯ জুলাইয়ের এই সফরে সার্জিও গোর অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করবেন। তিনি সফরকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে পরিচিত হতে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমীরের সাথে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হতে পারেন।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর ম্যানিলা সফরে ছিলেন। ম্যানিলায় ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোসের সাথে সাক্ষাতের পর নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’ (টুইটার) বার্তায় তিনি লেখেন, “একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বজায় রাখার গুরুত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত আন্তরিক ও গঠনমূলক বৈঠক ছিল, যা আমাদের দুটি দেশের মধ্যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্ব তুলে ধরে। কোয়াডের চলমান সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে আমি প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেছি।” ম্যানিলা থেকে সরাসরি নয়াদিল্লী হয়ে সার্জিও গোরের এই ঢাকা সফর ইঙ্গিত দেয় যে, অঞ্চলটির শক্তি ভারসাম্যে ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও অভিজ্ঞ কূটনৈতিকদের মতে, বিগত সময়ের একমুখী বা তোষণমূলক নীতি থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সার্বিক ও স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উপযুক্ত সময় এসেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের নতুন সরকারের নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। আমরা চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কারও পকেটে ঢুকতে চাই না। চীন আমাদের বড় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ঋণের উৎস, যা আমাদের প্রয়োজন। আবার যুক্তরাষ্ট্র হলো আমাদের তৈরি পোশাক ও বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাজার, যেখানে আমাদের পণ্য বিক্রি করে আমরা টিকে থাকি। দুই বড় পরাশক্তির কাউকেই আমরা চটাতে চাই না, আবার কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটেও অন্ধভাবে পা বাড়াতে চাই না।”