logo

আইন ও আদালত

রংপুরের ৪ খুন

সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে জেলগেটে ৬ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ ॥ মিলেছে তথ্য

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে শেষ দফায় জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

রংপুর অফিস
Printed Edition

রংপুর অফিস

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে শেষ দফায় জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

গতকাল বুধবার সকাল ১১টা ১০ মিনিট থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে তদন্ত সংস্থার কেউ কোনো কথা বলেননি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জিন্নাত আলী রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে ওই দুই আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ডিবির আরও দুই সদস্য ছিলেন। এর আগে আদালতের আদেশ অনুযায়ী ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আসামী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে প্রথম দফায় তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

গত সোমবার রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলাম আসামীদের জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। পুলিশ তিন দিনের রিমান্ড চেয়েছিল। আদালত তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দুই দিন প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।ওই দিন আসামী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ডোপ টেস্টের ফল প্রকাশ করে পুলিশ জানায় তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ভাষ্য, দেরিতে ডোপটেস্ট করায় এমন ফল এসেছে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য যা যা করণীয় সবই করবে পুলিশ

গতকাল বুধবার বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ জানান, শিক্ষক পরিবার হত্যাকা-ে অভিযুক্ত দুই আসামীকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে যে আদেশ পেয়েছিলাম, তার শেষ দিন ছিল বুধবার (আজ)। দুদিনে আমরা আসামীদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা এ হত্যাকা-ের প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখব, কারণ মামলার তদন্তের সীমা নেই। তদন্তের প্রয়োজনে আমাদের যতটুকু গভীরে যাওয়া দরকার আমরা সেটাই করব। এবং আমরা এসব তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এ মামলার সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য যা যা করণীয় সবই আমরা করব।

এদিকে, আদালতে দেওয়া দুই আসামীর ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী এবং পুলিশের কাছে দায় স্বীকার করে দেওয়া তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেও হত্যাকা-ের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।

হত্যাকা-ের দেড় মাস আগে বাড়ি বিক্রি, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলোচিত এ হত্যাকা-ের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির লাগোয়া। হত্যাকা-ের প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রি করে দেন তারা। এ জন্য বায়না চুক্তিও করা হয়। বাড়ির দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের শিলিগুড়িতে সপরিবারে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

বিধান চন্দ্র দাস স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক। তিনি জানান, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না সূত্রে জমিটি কিনেছেন।

হত্যাকা-ের আগের ১২ ঘণ্টায় মুগ্ধ-সিদ্ধার্থের ৩০ বার ফোনালাপ

দুই আসামীর মোবাইল ফোনের অস্বাভাবিক ফোনকল রেকর্ডের তালিকাও পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। গত ১৯ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮০ ঘণ্টার কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হত্যাকা-ের আগে ও পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের মধ্যে ৮০ বার ফোনে কথা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকা-ের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধের একটি নম্বরে ৩০ বার ফোন করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ফোনকলের প্রতিটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১১ থেকে ১৭ সেকেন্ড। এ ছাড়া কয়েকটি কলে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত থাকায় সন্দেহভাজনের তালিকাও বড় হচ্ছে। এসব তথ্য সামনে আসার পর হত্যাকা-ের বিষয়ে নতুন মাত্রায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মধ্যে ঘটনার আগে এবং পরে অনেকবার কথা হয়েছে। ৮০ ঘণ্টায় ৮০ বার কথা বলেছে তারা। এর অর্থ ঘটনার আগে এবং পরে প্রতি ঘণ্টায় একবার; যা অস্বাভাবিক এবং এ কারণে হত্যার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে হতে পারে। হত্যাকা-ের আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে ৩০ বার ফোনালাপের বিষয়টিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকা থেকে প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। আসামীরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। মামলাটি বর্তমানে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।