logo

শিক্ষাঙ্গন

১৯ বছরের রেকর্ড ভেঙে চট্টগ্রাম বোর্ডে ফল বিপর্যয়

এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটিই এ বোর্ডের সবচেয়ে খারাপ ফল। এর আগে ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এরপর আর কখনো পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি।

চট্টগ্রাম ব্যুরো
Printed Edition

এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার ফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটিই এ বোর্ডের সবচেয়ে খারাপ ফল। এর আগে ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এরপর আর কখনো পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি।

গত বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ । একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। গত বছর ১১ হাজার ৮৪৩ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন।

এবার বোর্ডের অধীনে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন। ফলে প্রায় ৫৩ হাজার শিক্ষার্থীই কৃতকার্য হতে পারেনি।

সোমবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের এসব তথ্য তুলে ধরেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী।

কোথায় বেশি ধস

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা মানবিক বিভাগে। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬০ দশমিক ১২ এবং বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশ।

জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে। মোট ৯ হাজার ৩৯৮ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ৮ হাজার ৩০২ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৯৯১ এবং মানবিক বিভাগে মাত্র ১০৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

ইংরেজি ও গণিতে বড় ধাক্কা

বিষয়ভিত্তিক ফলাফলও উদ্বেগের চিত্র দেখিয়েছে। বাধ্যতামূলক ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার সবচেয়ে কম-৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এ বিষয়েই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

সাধারণ গণিতেও ফল ভালো নয়। এ বিষয়ে পাসের হার ৮০ দশমিক ০৫ শতাংশ।

তবে অন্যান্য বিষয়ে পাসের হার তুলনামূলক বেশি। বাংলায় ৯৬ দশমিক ৮৬, সাধারণ বিজ্ঞানে ৯২ দশমিক ৬৩, রসায়নে ৯৭ দশমিক ০৭, পদার্থবিজ্ঞানে ৯২ দশমিক ১৯, জীববিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৯৩ এবং উচ্চতর গণিতে ৯০ দশমিক ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

হিসাববিজ্ঞানে ৯৩ দশমিক ৫৮, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ৯৪ দশমিক ৪৮, ব্যবসায় উদ্যোগে ৯৭ দশমিক ১৪, ধর্মে ৯৯ এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ৯৯ দশমিক ০৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

পার্বত্য জেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ

জেলাভিত্তিক ফলাফলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য এলাকার মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং কক্সবাজারে ৫৭ দশমিক ০৯ শতাংশ।

অন্যদিকে রাঙামাটিতে পাস করেছে মাত্র ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ, বান্দরবানে ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং খাগড়াছড়িতে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।

অবশ্য চট্টগ্রাম মহানগরে পাসের হার তুলনামূলক ভালো-৭৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

আট স্কুলে শূন্য পাস

এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৮৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নারায়ণহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনজন এবং সন্দ্বীপের উরকিরচর জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে কেউ পাস করেনি।

রাঙামাটির বরকলের আঁধার মানিক জুনিয়র হাইস্কুল থেকে ১০ জন, লংগদুর মহালছড়ি হাইস্কুল থেকে ১৫ জন এবং বাঘাইছড়ির শিজক দজরবাজার জুনিয়র হাইস্কুল থেকে পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের একজনও উত্তীর্ণ হয়নি।

এ ছাড়া খাগড়াছড়ি সদরের ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৭ জন, দীঘিনালার জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯ জন এবং তারাবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঁচজন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।

তবে বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বোর্ডের ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।

কারিকুলাম পরিবর্তনই কি দায়ী?

ফল বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চিহ্নিত করতে পারেনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে ফলাফলের এমন অবনতির কারণ নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ তাদের হাতে নেই।

তবে তিনি মনে করেন, এবারের পরীক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে একটি কারিকুলাম এবং দশম শ্রেণিতে পরিবর্তিত নতুন কারিকুলামে পড়াশোনা করেছে। শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিবর্তন ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু শুধু কারিকুলাম পরিবর্তন দিয়ে এত বড় পতনের ব্যাখ্যা মেলে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ পাসের হার ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইংরেজি ও গণিতে বড়সংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা এবং পার্বত্য তিন জেলায় অত্যন্ত কম পাসের হার শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের আরও কিছু দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ পাসের হার, আটটি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস এবং ৫২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ জরুরি।

ফল প্রকাশের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে-এটি কি সাময়িক ফল বিপর্যয়, নাকি চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটের বহিঃপ্রকাশ? সেই উত্তর খুঁজতে বিষয়ভিত্তিক, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রশাসনের মতামতও জরুরি হয়ে পড়েছে।