ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রকাশ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ডাকসুর সভাকক্ষে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর জিএস এস. এম. ফরহাদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রকাশ’-এর সম্পাদক ও ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এস. এম. ফরহাদ বলেন, সমাজের সংস্কৃতি মূলত সাহিত্যের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে। একটি সমাজ কীভাবে চলত, সে সময় মানুষের জীবনযাপন কেমন ছিল, সমাজে কী কী উপাদান ছিল এবং কীভাবে সমাজ বিকশিত হচ্ছিল—এসব জানতে হলে সেই সময়ের গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও স্মৃতিচারণ পড়তে হয়।
তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়, দেশ বা সমাজকে বুঝতে হলে শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের কাছেই ফিরে যেতে হয়। এক হাজার বছর আগের কোনো দেশের সমাজব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে হলেও সেই সময়ের সাহিত্যকর্ম অনুসন্ধান করতে হয়। তা ফার্সি, ইংরেজি, ল্যাটিন কিংবা হিব্রু—যে ভাষাতেই রচিত হোক না কেন, সাহিত্য একটি সমাজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
ডাকসুর প্রকাশনা কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডাকসুর উদ্যোগে অন্তত ২০টি ম্যাগাজিন প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে এটি পঞ্চম প্রকাশনা অনুষ্ঠান। এর আগে বিভিন্ন সাময়িকী ও নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ডাকসুর প্রথম নিয়মিত ম্যাগাজিনের নাম ছিল ‘আভাস’। এবারের ‘প্রকাশ’ নিয়মিত ম্যাগাজিনের দ্বিতীয় সংখ্যা। এতে স্মৃতিলেখা, গল্প, কবিতা, বই পর্যালোচনাসহ বিভিন্ন ধরনের লেখা স্থান পেয়েছে। একটি সমাজকে পাঠ করা, তার বিকাশের সূচক বোঝা এবং বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের চিন্তা ও আচরণ অনুধাবনের সুযোগ তৈরি করতেই এসব বৈচিত্র্যময় সাহিত্যিক রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ‘প্রকাশ’-এর সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সবাইকে ধারণ করার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য অঙ্গনে এক ধরনের খরা বিরাজ করছে এবং অনেক সময় সাহিত্য সমাজের সব মানুষকে ধারণ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক সংকটের একটি কারণও সমাজের সব মানুষ ও মতকে ধারণ করতে না পারা। বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শহরকেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট প্রভাববলয় রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য তুলে ধরে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আলাওল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রচিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আলাওল, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যসহ প্রায় হাজার বছরের পুরোনো সাহিত্যকর্মে এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, পুঁথি সংগ্রাহক আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামের মানুষ ছিলেন। তাঁর সংগ্রহে বিপুলসংখ্যক প্রাচীন পুঁথি ও পান্ডুলিপি জমা হয়েছিল। এটিও প্রমাণ করে, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে এ অঞ্চলের অবদান কতটা সমৃদ্ধ ছিল।
সাহিত্যের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সাহিত্য বিকশিত হয় প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে। আলাওল আরাকান রাজসভায় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন বলেই ‘ইউসুফ-জুলেখা’র মতো সাহিত্যকর্ম রচনা করতে পেরেছিলেন। কেউ শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন, আবার কেউ পেয়েছেন পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতা।
মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, সাহিত্য যদি মানুষের হয়, মানুষের কণ্ঠস্বর হয় এবং সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে, তাহলে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা ক্ষমতা কাঠামোর হাত থেকে সরিয়ে পাঠকের হাতে নিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে প্রকাশনার মাধ্যমে লেখকের প্রাপ্য রয়্যালটি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও পাঠকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নতুন নজরুল, ফররুখ ও রবীন্দ্রনাথ তৈরি হওয়ার পথ আরও সুগম হবে।
সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রকাশ’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন সাবিকুন্নাহার তামান্না, আফসানা আক্তার, খন্দকার নুর হোসাইন, রিয়াদুল ইসলাম যুবা, রিজওয়ান য্যুবরান মানসুরী, সায়মুম ফেরদৌস, আসফাকউল্লাহ আসিফ ও সুহাইল মাহদিন প্রমুখ।
রিয়াদুল ইসলাম যুবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন (খান জসিম), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ইকবাল হায়দার, কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে ছালমা এবং ডাকসু, হল সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।