logo

বাংলাদেশ

আগামী ৫ বছরে রফতারনি বাজার ৫০০ কোটি ডলাপর উন্নীত করার লক্ষ্য

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারে নজর ঢাকার

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তথা পূর্ব দিগন্তে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারে নজর ঢাকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আসিয়ান বলয়টি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চল।

মুহাম্মদ নূরে আলম
Printed Edition

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তথা পূর্ব দিগন্তে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারে নজর ঢাকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আসিয়ান বলয়টি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চল। মোট ১১টি দেশ (১০টি আসিয়ান সদস্য এবং পূর্ব তিমুর) নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬৮ কোটি ৫০ লাখ। এই বিপুল জনসংখ্যার একটি বড় অংশই হলো মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোক্তাশ্রেণী, যাদের ক্রয়ক্ষমতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এত বড় একটি বাজার হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের পরিমাণ মাত্র ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি; এই বাজার আগামী ৫ বছরে ৫০০ কোটির মার্কিন ডলারে উন্নিত করার লক্ষ্য বাংলাদেশের। এই অঞ্চলে প্রধান সম্ভাবনাময় খাতসমূহ হলো; আরএমজি, ওষুধ, পাটজাত পণ্য, চামড়া, আইটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাজার সম্প্রসারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুনসহ এই বিভাগের কর্মকর্তারা এই বিষয়ে কাজ করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এইসব তথ্য জানা যায়।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানান, আসিয়ানের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারলে আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ব্লক ‘আরসিইপি’-তে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার পথ সুগম হবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স ও লজিস্টিকস খাতে বাংলাদেশে বিপুল সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ আনা সম্ভব হবে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার সংকোচনসহ বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জও কড়া নাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। পরিবর্তিত এই বিশ্ববাণিজ্যের নতুন সমীকরণে টিকে থাকতে এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে প্রচলিত ইউরোপ-আমেরিকার বাজারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমানোর কোনো বিকল্প নেই মত দেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রেক্ষিতে উদীয়মান ও বিশাল সম্ভাবনাময় অঞ্চল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে দ্রুত ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ জোরদারের জোরালো আহ্বান জানিয়েছে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সেই লক্ষে গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এই জোরালো আহ্বান জানান। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা।

ব্যবসায়ী নেতাদের এই সময়োপযোগী আহ্বানের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোভাব পোষণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, উদীয়মান বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে আমাদের পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, ফলমূল, সিরামিকসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তাদের আরও বেশি দূরদর্শী ও মনোযোগী হতে হবে।” এ ক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন। এলডিসি উত্তরণের পর দেশের বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে মোট ১১টি দেশ রয়েছে (১০টি আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্র: ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং নবাগত পূর্ব তিমুর)। এই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৬৮ কোটি ৫০ লাখ। এটি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল একটি মধ্যবিত্ত ও ভোক্তাশ্রেণীর বাজার, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। এত বড় একটি বাজার হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের পরিমাণ মাত্র ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। বিপরীতে, জ্বালানি, ভোজ্যতেল ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে এই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা হলে এই অঞ্চলে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পণ্যের বাজার ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব। আসিয়ান দেশগুলোর ফ্যাশন সচেতন তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় চাহিদা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ফিলিপাইন, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশের মানসম্মত ও সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধের ব্যাপক কদর রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের দক্ষ পেশাদারদের বড় সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া হিমায়িত মৎস্য, সিরামিক টেবিলওয়্যার এবং বিশেষায়িত পাটজাত পণ্য এই বাজারে সহজেই প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

এলডিসি উত্তরণ এবং নতুন বাজারের খোঁজ: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা ২০২৬ সালের পর পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা শুরু হলে এই প্রচলিত বাজারগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধাক্কা সামলাতে হলে এখনই নতুন এবং নন-ট্র্যাডিশনাল বা অপ্রচলিত বাজারগুলোতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে বড় গন্তব্য হতে পারে এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলের সাথে বাণিজ্যের আরেকটি কৌশলগত দিক হলো ‘আরসিইপি’ বা রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পারলে বিশ্বের বৃহত্তম এই আঞ্চলিক বাণিজ্যিক ব্লকে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার পথ সুগম হবে। একই সাথে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকে প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও আমেরিকার স্টেট ইউনির্ভাসিটির নিউইয়র্ক সহযোগী অধ্যাপক ড. ইমরান আনসারী বলেন, বাংলাদেশের উচিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে একটি কৌশলগত প্রবৃদ্ধি করিডোর হিসেবে বিবেচনা করা। উপযুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং খাত-ভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে নিজেকে একটি প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহকারী ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এজন্য বাংলাদেশের বিদেশি মিশনগুলোকে ‘বিজনেস হাব’-এ রূপান্তর করতে হবে। এই অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সফল করতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকদের অভিজ্ঞাতাকে কাজে লাগাতে হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে কেবল প্রথাগত কনস্যুলার সেবা বা পাসপোর্ট নবায়নের কাজে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এগুলোকে এক একটি ‘বিজনেস হাব’ বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। কমার্শিয়াল উইংয়ের কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট বার্ষিক রপ্তানি টার্গেট বেঁধে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি, নিয়মিত বাণিজ্য মেলা আয়োজন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল ও রোড-শো পরিচালনা করতে হবে।

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ২০২৬ সালের পর বৈশ্বিক বাণিজ্যের মহাসমুদ্রে বাংলাদেশকে একাই সাঁতার কাটতে হবে। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশের ৬৮ কোটি ৫০লাখের এই বিশাল ভোক্তাশ্রেণীর বাজার হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী দিনের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।