logo

জাতীয়

কৃষিজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের মানববন্ধন

‘সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারি মূল্যে কৃষকদের সার দিতে হবে’ : আতিকুর রহমান

সার সংকট নিরসন, সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারি মূল্যে সার সরবরাহ ও বন্ধ কারখানা চালুর দাবিতে কৃষিজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের মানববন্ধন।

অনলাইন ডেস্ক
ছবি: দৈনিক সংগ্রাম

কৃষকদের স্বার্থে সার সংকট নিরসন, সার সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ এবং বন্ধ সার কারখানাগুলো দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান।

তিনি বলেন, কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমের কারণেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। অথচ দেশের কৃষি এগিয়ে নেওয়া সেই কৃষকরাই বর্তমানে কৃষিকাজের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপকরণ সার নিয়ে সংকটে পড়েছেন।

বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ কৃষিজীবী শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি. নং বি-২১৩৩) উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম রব্বানীর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, সাধারণ সম্পাদক এস. এম. শাহজাহান, সহ-সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্তারুজ্জামান এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রফেসর মো. আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াসহ অন্যরা।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, কৃষকরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে এবং বজ্রপাতের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ফসল উৎপাদন করেন। অথচ গণমাধ্যমে সারের সংকট নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পরও সরকারের পক্ষ থেকে দেশে সার সংকট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, দেশে যদি সারের সংকট না থাকে, তাহলে কৃষকরা সার পাচ্ছেন না কেন?

তিনি অবিলম্বে সার সংকট নিরসন, সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারি মূল্যে কৃষকদের সার সরবরাহ এবং বন্ধ সার কারখানাগুলো চালুর দাবি জানান।

সরকারের পক্ষ থেকে সংকট স্বীকার না করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিক সংগঠন করি। আমরা কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে আসিনি। তবে খুবই পরিতাপের বিষয় হলো, দেশে যখন কোনো সংকট তৈরি হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে সেই সংকটকে সংকট হিসেবে স্বীকার করতে চায় না।’

সম্প্রতি তেলের সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তেলের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন থাকলেও দাম বাড়ানোর পর সংকটের কথা আর শোনা যায়নি। এখন সারের সংকট দেখা দিয়েছে। তাহলে এই সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সারের দাম বাড়ানোর কোনো পাঁয়তারা চলছে কি না—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

আতিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিভিন্ন এলাকায় বেশি দামে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করা হচ্ছে। দালালচক্র সিন্ডিকেট করে ইউরিয়া সারের দাম বাড়িয়ে কৃষকদের কষ্টার্জিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সরকার যদি কোথাও কালোবাজারি সম্পর্কে অবগত থাকে, তাহলে এখন পর্যন্ত জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন—এ প্রশ্নও তিনি তোলেন।

তিনি বলেন, সিন্ডিকেট করে কালোবাজারি ও অবৈধভাবে বেশি দামে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের কারণে কেউ যেন আইনের আওতা থেকে রেহাই না পায়, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।

কৃষিমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের এসি রুমে বসে ব্রিফিং করা সহজ। কিন্তু যারা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, বজ্রপাতের মৃত্যুঝুঁকি উপেক্ষা করে মাঠে ফসল ফলান, তাদের দুঃখ-কষ্ট জানতে হলে একবার মাঠে আসুন।’

তিনি আরও বলেন, কৃষক প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিতি দেখতে পাননি। কৃষকের বাস্তব সমস্যা জানতে হলে মন্ত্রণালয়ের দপ্তরের বাইরে গিয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখার আহ্বান জানান তিনি।

বিশ্বব্যাংকের একটি আগাম সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ তুলে আতিকুর রহমান বলেন, ইউরিয়া সারের সংকট ও কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি হলে প্রান্তিক পর্যায়ের প্রায় ১৪ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে আগাম সতর্কতা ছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, দেশের ৯২ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক যদি ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধির শিকার হন, যথাসময়ে সার না পান এবং উচ্চমূল্যে কালোবাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য হন, তাহলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাজারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

সরকারি সার কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। আতিকুর রহমান বলেন, দেশের সরকারি সাতটি সার কারখানার মধ্যে ছয়টিতে উৎপাদন হচ্ছে না। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ থাকলেও গত ছয় মাসে সেগুলো চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, কৃষকদের ধোঁকা না দিয়ে সারের প্রকৃত পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর সারব্যবস্থা কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

মানববন্ধন থেকে কৃষকদের স্বার্থে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রান্তিক কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা, দলীয় লোক দিয়ে ডিলার পরিচালনার ব্যবস্থা বাতিল, ডিলারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, বন্ধ সার কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা, কালোবাজারি ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, সার আমদানি প্রক্রিয়া স্থিতিশীল করা এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের সার পাওয়া নিশ্চিত করা।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, কৃষককে বাঁচাতে হলে সারের সংকট ও কালোবাজারি বন্ধ করতে হবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষিপণ্যের বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।