logo

বিদ্যুত-জ্বালানি

সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

৫৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতি

দেশে সাম্প্রতিক সময়ের নজিরবিহীন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বিগত দেড় যুগের ‘ভুল নীতি’ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের হঠাৎ অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

Printed Edition

সংসদ রিপোর্টার

দেশে সাম্প্রতিক সময়ের নজিরবিহীন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের পেছনে বিগত দেড় যুগের ‘ভুল নীতি’ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের হঠাৎ অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল বিগত ৫৫ বছরের মধ্যে গত ৯ আগস্টে ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতি হয়েছে বলে জানান।

এই ঐতিহাসিক ঘাটতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, নিছক কথামালার আড়ালে সত্য লুকানোর কোনো সুযোগ নেই। জনগণের এই অনাকাক্সিক্ষত ও সাময়িক কষ্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন, কারিগরি সমস্যা সমাধান ও সরকারের নেওয়া নতুন পদক্ষেপের ফলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাসভিত্তিক ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও তার জন্য দৈনিক ১৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি মিলে মোট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২৩০০ থেকে ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সব গ্যাস সরবরাহ করলে শিল্প খাত ও বাসা-বাড়ির গ্যাস সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ফলে সার্বিক অর্থনীতি রক্ষায় শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতের মধ্যে বাধ্য হয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

কারিগরি বিপর্যয় ও চুক্তির ঘাটতির তথ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট বর্তমানে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া আদানির সঙ্গে সম্পাদিত আগের চুক্তি অনুযায়ী ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যাচ্ছে দিনে ৯০০ ও রাতে ১১০০ মেগাওয়াট। এর ওপর গত ২১ জুলাই আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি এফএসআরইউ-এর একটি নষ্ট হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে, যার প্রভাব এসে পড়ে বিদ্যুৎ খাতে। তবে বর্তমানে এই সংকটের ৮৮ শতাংশই সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, চাইলে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো ‘পিকিং পাওয়ার প্লান্ট’ হওয়ায় একটানা চালানো যায় না এবং এদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। সে হিসাবে ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে আমরা সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পেতে পারি, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বিগত ফ্যাসিস্ট আমল এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুঞ্জীভূত বকেয়া হিসেবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই সংকট সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা দ্রুত এসব ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক কেন্দ্রে প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া মাতারবাড়ী ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বর্তমানে কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। এগুলো যেন দ্রুততম সময়ে পূর্ণ ক্ষমতায় ফিরতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের কড়া নজরদারি রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে আমাদের সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। রাত ৮টার পর বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে যথাযথ পালনে আমি সব সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।

অমিত বলেন, মধ্যমেয়াদি সমাধানের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে ‘রূপটপ সোলার’ বা ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। আগামী গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে দেশব্যাপী সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল পয়লা সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে যে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রূপটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করবেন, তারা আগামী তিন বছর পর্যন্ত তাদের উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। এতে করে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ টাকা তুলে আনা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী গতকাল বুধবার আরও একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাসা বাড়ি বা বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও ভোল্টেজ রেগুলেটর আমদানির ক্ষেত্রে আগামী ছয় মাসের জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ করা হয়েছে। আমদানিকারকদের কেবল ১ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি দিতে হবে। এর ফলে আগামী গ্রীষ্মেই দেশবাসী সুফল পেতে শুরু করবেন।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বিগত দেড় যুগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি খুলনা-৩ আসনে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লাইনের সক্ষমতা না বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট একটি ভৌগোলিক এলাকার (মধ্যপ্রাচ্য) ওপর জ্বালানি আমদানির জন্য নির্ভরশীল থাকার ভুলের মাশুল আজ মফস্বলের মানুষকে দিতে হচ্ছে। আমরা আজ জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনায় মনোযোগ দিয়েছি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের যে কষ্ট হচ্ছে, তার জন্য আমি আবারও দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করতে চাই, পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশবাসীকে ধৈর্য ধারণের অনুরোধ জানাচ্ছি, ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই এই সংকট কেটে যাবে।