logo

বই

পাঠ্যভ্যাসই সেরা অভ্যাস

বই জ্ঞানে আলোর সাগর

মলাটবন্দি মুদ্রিত পৃষ্ঠার নাম বই। বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। বই আনন্দ দেয়। বই মনকে আনন্দে পুলকিত করে। বই রক্তশিরায় সুখের শিহরণ জাগায়। বই নিঃসঙ্গতা দূর করে। বই বিষন্নতা তাড়িয়ে দেয়। বই মনকে তাজা করে।

Printed Edition

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

মলাটবন্দি মুদ্রিত পৃষ্ঠার নাম বই। বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক। বই আনন্দ দেয়। বই মনকে আনন্দে পুলকিত করে। বই রক্তশিরায় সুখের শিহরণ জাগায়। বই নিঃসঙ্গতা দূর করে। বই বিষন্নতা তাড়িয়ে দেয়। বই মনকে তাজা করে। তেজোদীপ্ত করে। বই প্রেরণা জোগায়, কর্মচঞ্চল করে। বই মনকে সুরভিত করে। বই মানুষের মনের কালিমা দূর করে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে। বই মগজকে জ্যোতির্ময় করে তোলে। বিজ্ঞানময় কুরআনের প্রথম বাণী হলো ‘পড়’ (হে নবী) তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। জমাটবাঁধা রক্তের দলা থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। পড় এবং তোমার রব বড় মেহেরবান, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা সে জানতো না। (সূরা আলাক : ১-৫)

উপরোক্ত আয়াত দ্বারা পড়ার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সা: পড়ার জন্য তথা জ্ঞানার্জনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। (ইবনে মাজাহ) তিনি আরো বলেছেন, রাতের কিছু অংশ জ্ঞানচর্চা করা গোটা রাত জেগে নফল ইবাদত করার চাইতে উত্তম। মানব সম্প্রদায়কে অজ্ঞানতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে বিশ্বনবী (সা:) এভাবেই গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম শাফিঈ (রহ:) বলতেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ নফল নামাজ অপেক্ষা উত্তম। আর বই হচ্ছে জ্ঞানার্জনের অন্যতম মাধ্যম। জ্ঞানার্জনে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।’ বই আত্মাকে পরিপুষ্ট করে, জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। বই হচ্ছে মানুষের সত্যিকারের বন্ধু, যা মানুষকে বুকের ভেতর সযত্নে লালন করা স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিতে পারে। যুগে যুগে বই জীবনের মানকে উন্নত করেছে, বুদ্ধিমত্তাকে শানিত করেছে, ধারণাকে গভীর করেছে এবং এভাবে এগিয়ে নিয়েছে মানব সভ্যতাকে। বই ছাড়া মানব সভ্যতার বিকাশ সম্ভব নয়। মানুষের ভাবনার বহিঃপ্রকাশের চিরায়ত মাধ্যম বই। চেতনার বিপ্লব ঘটাতে, নৈতিক ও মানবিক বোধ জাগ্রত করতে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। একজন সৃজনশীল মানুষ পৃথিবীতে বইয়ের বিকল্প কিছুই চিন্তা করতে পারেন না।

সমাজ বদলাতে ও দেশের উন্নয়ন করতে চাইলে বই পড়ার বিকল্প নেই। ভালো বই মানুষের উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। বই পড়া মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে মানবকল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। তাই সুসময়ে-অসময়ে বই হোক অবলম্বন, ভালোবাসা হোক বইয়ের সঙ্গে, বই হোক প্রিয় বন্ধু। একজন পাঠক মাত্রই জ্ঞানের সাধক, জ্ঞানের কাঙাল, জ্ঞানের উপাসক। তাই বই পড়ে একজন মানুষ জ্ঞানী হোন, নীতিবান হন, গুণী হন, বিবেক জাগ্রত আলোকিত মানুষ হোন। বই সুুন্দর জীবনের পথ দেখায়, গড়ে দিতে পারে আদর্শের প্রেরণা। দুঃখ কষ্টকে জয় করে দুর্বার গতিতে সামনে এগোবার মন্ত্র শেখায়। অথচ বর্তমানে আমাদের সমাজের কঠিন সময় যাচ্ছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীরা অস্থির সময় অতিক্রম করছে। বিশ্বায়নের ক্ষয়িষ্ণু সংস্কৃতির আগ্রাসনে ভাসছে, পথ হারাচ্ছে, বিভ্রান্ত হচ্ছে। ভালো-মন্দ বিচার করতে গিয়ে সঙ্কটে পড়ছে। সত্য সঠিক পথ বেছে নিতে গিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো ভালো বই পড়া। নিয়মিত বই পড়ে তরুণ সমাজ একদিন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে। বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী হয়। তার মধ্যে প্রকৃত মনুষ্যগুণ তৈরি হয়। তাই প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও বই পড়া উচিত। হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও বই পড়ার জন্য প্রতিদিন কিছু সময় বরাদ্দ করতে হবে। তরুণ-তরুণীদেরকে ভুলের চোরাবালিতে পা ফেললে চলবে না। আগামী দিনের সুুন্দর, টেকসই, সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ার দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত। আর একটি সৃষ্টিশীল সমাজ, উন্নয়নশীল দেশ, সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণে বইয়ের বিকল্প কিছু নেই। মানবতার কল্যাণে জ্ঞান সাধনা করে যিনি আজও বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন তিনি হচ্ছেন ইবনে রুশদ। কথিত আছে, এ বরেণ্য সাধক বিয়ে ও বাবার মৃত্যুর রাত ছাড়া আর কোনো রাতেই বই পড়া বন্ধ করেননি।

বাংলা গদ্যসাহিত্যের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছোটকাল থেকেই ছিলেন মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু। রাতে বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করার মতো সঙ্গতি তাদের ছিল না। তাই কিশোর ঈশ্বরচন্দ্র সন্ধ্যার পর পথের পাশে জ্বালানো গ্যাসের বাতির নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন। বইপড়ুয়া ঈশ্বরচন্দ্র ছাত্রজীবনে নানা বিষয়ে কৃতিত্বের জন্য ‘বিদ্যাসাগর’ নামেই পরিচিত লাভ করেন। বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনে বই ছিল নিত্যসঙ্গী। ভালো বই পেলে তিনি এতো একাগ্রতা ও মনোযোগ দিয়ে পড়ে যেতেন যে, বাইরের কোনো কোলাহল, ক্ষুধা, ঘুম কোনো কিছুই তার বইয়ের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারতো না। বইপ্রিয় এই বরেণ্য মানুষটি বই পড়ার একাগ্রতার জন্য কখনো কখনো বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন।

এমনি একটা ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের নির্জন কক্ষে বসে বইপ্রেমিক ড. শহীদুল্লাহ মন দিয়ে বই পড়ছিলেন। সময় গড়িয়ে যায়। গ্রন্থাগার বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার। যখন খেয়াল হলো তখন উঠে গিয়ে দেখলেন জানালা দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো। অগত্যা কষ্ট করে জানালা খুলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, কাউকে পাওয়া যায় কি না? এক পথচারীকে ডেকে জানালেন তার বন্দিত্বের কাহিনী। পথচারী খবর দেন গার্ডকে। গার্ড ছুটে আসে গ্রন্থাগারের দরজা খুলে মুক্ত করেন বইপ্রেমিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে। ওয়ারেন বাফেট একজন মার্কিন ব্যবসায়ী। বিশ্বের ধনী মানুষের নামের তালিকায় ওয়ারেন বাফেটের অবস্থান দ্বিতীয়। এই সফল মানুষটি অবসরে শতকরা ৮০ ভাগ সময়ই বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। এইচবিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, এখনো দিনের পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা তিনি বই পড়ার পেছনে ব্যয় করেন। নরমাল মেলর বলেছেন, আমি চাই যে বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়।

বিখ্যাত সমাজতত্ত্ববিদ আল বেরুনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে একদিন অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছেন। পাশে অবস্থানরত তার এক বন্ধু। তিনি তাকে বললেন, জ্যামিতির একটি সংজ্ঞা আমার জানা দরকার। বন্ধুটি বললেন, তুমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এসব এখন জেনে কী লাভ হবে? আল বেরুনি প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, মৃত্যুর আগে এটি আমি জেনে যেতে পারলে হয়তো আমার জীবনটা আরও ধন্য হবে। জ্ঞানের শেষ নেই। জ্ঞান অর্জনে বইয়ের বিকল্প কিছুই নেই। ড. মুহাম্মদ এনামুল হক বলেছেন, ‘কেবল বই পড়েই মানুষ তার পরিপূর্ণ জীবনের একটা ইঙ্গিত, একটা সঙ্কেত আভাস লাভ করতে পারে।’ সৈয়দ মুজতবা আলী ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে লিখেছেন, বই কিনে কেউ তো কখনও দেউলিয়া হয়নি। বই কেনার বাজেট যদি আপনি তিনগুণও বাড়িয়ে দেন, তবুও তো আপনার দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি আরো বলেছেন, চোখ বাড়াবার পন্থাটা কী? প্রথমত বই পড়া এবং তার জন্য দরকার বই পড়ার প্রবৃত্তি।

মুসলিম উম্মাহর গর্বের মুকুট ইমাম মুসলিম (রহ:)। তার সংকলিত সহিহ হাদিসশাস্ত্র মুসলিম উম্মাহর গৌরবস্তম্ভ। ইমাম মুসলিম (রহ:)-কে এক মজলিসে এক ব্যক্তি একটি হাদিস জিজ্ঞেস করে। হাদিসটি তখন তার স্মৃতিতে উপস্থিত ছিল না। মজলিস শেষে ঘরে ফিরে নেমে পড়েন জিজ্ঞাসিত হাদিসটির সন্ধানে। স্মৃতি ও গ্রন্থাদি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। এদিক প্রচণ্ড ক্ষুধা। পাশেই টুকরিতে খেজুর রাখা ছিল। বই ঘাঁটছেন। একটা করে খেজুর মুখে দিচ্ছেন। এই ছন্দময় নিñিদ্র মগ্নতায় কেটে যায় পুরো রজনী। অলক্ষ্যে উজাড় খেজুরের পাত্রও। ততক্ষণে কাক্সিক্ষত হাদিসখানাও হাতে পড়েছে।

পড়ার নেশায় অলক্ষ্যে ভক্ষিত এই খেজুরই তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। সেটা ছিল হিজরি ২৬১ সালের ২৪ রজব রোববার। পৃথিবীর যেখানেই যারা আলো ছড়িয়েছেন; প্রতিষ্ঠার আকাশে নক্ষত্র হয়ে পথ দেখিয়েছেন, প্রসারিত ছায়া দিয়ে ধন্য করেছেন সময় ও সমকালীনদের তাদের বেড়ে ওঠার ইতিহাসটা এমনই হয়।

সারা বিশ্বের সকল কিশোরের জনপ্রিয় বই ‘হ্যারিপটার’-এর লেখিকা জে কে রাউলিংকে একজন প্রশ্ন করেছিলেন, আপনাকে যদি কোনো মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তাহলে সঙ্গে কী নিবেন? কোনো সময় ক্ষেপণ না করে রাউলিং উত্তর দিয়েছিলেন শেকসপিয়র-সমগ্র সাথে নেবো। অর্থাৎ বই নেবো।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, ‘একেকটা বই একেকটা জানালার মতো। ঘরের জানালা দিয়ে যেমন বাইরে সব কিছু দেখা যায়, তেমনি বই পড়লেও আগামীটা দেখা যায়।’ মানবজীবনে বইয়ের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে লিও টলস্টয় বলেছেন, জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই।