logo

গল্প

তুতুলের বৈশাখ

গ্রামের নাম সোনাঝুরি। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড় আর পাখির ডাক। সেই ছোট্ট সুন্দর গ্রামেই থাকে একটি মিষ্টি মেয়ে-িতার নাম ‘তুতুল’। তুতুল খুব চঞ্চল আর কৌতূহলী। নতুন কিছু দেখলে সে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।

Printed Edition

পান্থজন জাহাঙ্গীর

গ্রামের নাম সোনাঝুরি। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড় আর পাখির ডাক। সেই ছোট্ট সুন্দর গ্রামেই থাকে একটি মিষ্টি মেয়েÑতার নাম ‘তুতুল’। তুতুল খুব চঞ্চল আর কৌতূহলী। নতুন কিছু দেখলে সে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। একদিন খুব ভোরে তুতুলের ঘুম ভাঙল অদ্ভুত এক শব্দে

“ঢুম ঢুম ঢুম... ঢাক ঢোলের আওয়াজ!”

তুতুল চোখ মেলে অবাক হয়ে শুনতে লাগল। তারপর দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখল, গ্রামের রাস্তা দিয়ে কয়েকজন মানুষ ঢোল বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে।

তুতুল মাকে ডাকল

মা, মা! এত সকালে ঢোল বাজছে কেন?

মা হেসে বললেন

আজ ‘পহেলা বৈশাখ’। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তাই সবাই আনন্দ করছে। র‌্যালি বের হয়েছে।

তুতুল খুব খুশি হলো। মা তাকে লাল-সাদা একটি সুন্দর জামা পরিয়ে দিলেন। চুলে গুঁজে দিলেন লাল জবা ফুল। তুতুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে খিলখিল করে হাসল।

বাবা বললেন চলো তুতুল, আজ আমরা বৈশাখী মেলায় যাব। তুতুল আনন্দে হাততালি দিল। তারা তিনজন মেলার পথে হাঁটতে লাগল। পথে পথে মানুষ নতুন কাপড় পরে বের হয়েছে। কেউ গান গাইছে, কেউ হাসছে, আবার কেউ ছোটদের হাত ধরে মেলার দিকে যাচ্ছে। মেলার কাছে যেতেই তুতুলর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। মেলার ফটকে রঙিন কাগজের ফুল আর আলপনা আঁকা। উপরে লেখাÑ

“শুভ নববর্ষ”।

ভেতরে ঢুকতেই তুতুল যেন রঙের এক জগতে এসে পড়ল। চারদিকে মানুষের ভিড়, হাসি আর আনন্দের শব্দ।

এক পাশে খেলনার দোকান। কাঠের ঘোড়া, হাতি, পাখি আর নৌকা সারি সারি সাজানো। রঙিন রঙে রাঙানো খেলনাগুলো দেখে তুতুলর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আরেক পাশে ছিল মাটির জিনিসের দোকান। ছোট ছোট মাটির হাঁড়ি, কলস, ফুলদানি আর মাটির ব্যাংক সাজানো। সূর্যের আলো পড়তেই সেগুলো চকচক করছিল।

হঠাৎ তুতুলর নাকে ভেসে এল মিষ্টি গন্ধ। সে তাকিয়ে দেখলÑএকটা বড় মিষ্টির দোকান। সেখানে জিলাপি, বাতাসা, নাড়ু, সন্দেশ আর রসগোল্লা সাজানো।

এক কাকু গরম গরম জিলাপি ভাজছিলেন। তুতুল বাবার হাত ধরে বললÑ

বাবা, আমি কি একটা জিলাপি খেতে পারি?

বাবা হেসে বললেন অবশ্যই পারো।

তুতুল গরম জিলাপি খেতে খেতে বললÑ

আহা! কী মজা!

মেলার আরেক পাশে কয়েকজন বাউল গান গাইছিল। তাদের হাতে একতারা। তারা গাইছিলÑ

“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...”

গানের সুরে পুরো মেলা মুখর হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ তুতুল দেখল কিছু ছেলে-মেয়ে বাঘ, পাখি আর ঘোড়ার মুখোশ পরে নাচছে। তাদের নাচ দেখে সবাই হাততালি দিচ্ছে।

আরেক কোণে একটা ছোট নাগরদোলা ঘুরছে। তাতে চড়ে শিশুরা হাসছে আর চিৎকার করছে। তুতুল বাবাকে বলল

বাবা, আমি নাগরদোলায় উঠব!

বাবা তাকে নাগরদোলায় বসিয়ে দিলেন। নাগরদোলা ঘুরতে শুরু করতেই তুতুল আকাশের দিকে তাকিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠলÑ

মা দেখো! আমি কত উঁচুতে উঠেছি!

মা নিচে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে হাসছিলেন। মেলা ঘুরে ঘুরে বিকেল হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার সময় বাবা তুতুলর জন্য একটা ছোট রঙিন বাঁশি কিনে দিলেন।

তুতুল বাঁশি বাজাতে বাজাতে হাঁটতে লাগল। সে বললÑ

মা, আজকের দিনটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন! মা মৃদু হেসে বললেনÑ

মনে রেখো তুতুল, নতুন বছর মানে নতুন আশা, নতুন আনন্দ।

সন্ধ্যায় সূর্য লাল হয়ে ডুবে গেল। আকাশে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল। তুতুল আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল

“শুভ নববর্ষ! এবার একটা গল্প লেখা হোক।’’

আর সোনাঝুরি গ্রাম ভরে উঠল বৈশাখের আনন্দে।