logo

গল্প

নীলাদ্রির স্পর্শ

আরমান শহরের ছেলে। ঢাকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কবিতা লেখে, গল্প লেখে, মানুষকে দেখে, আবার মানুষের ভেতরেই হারিয়ে যায়। কিন্তু তার ভিতরে জমে উঠছিল এক ধূসর হাহাকারÑ নতুন কিছু, হৃদয়ছোঁয়া কিছু খুঁজে ফিরছিল সে।

Printed Edition

শফিকুল মুহাম্মদ ইসলাম

নীল রঙের এক পাহাড়Ñ যার নাম ‘নীলাদ্রি’। গারো পাহাড়ঘেরা শান্ত-নির্জন এক এলাকা, যেখানে পাখির ডাক আর হাওড়ের ঢেউ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই। প্রকৃতি এখানে নির্জনতার গান গায়, আর সেই নির্জনতায় একদিন পা রাখে সাহিত্যপ্রেমী এক তরুণÑ আরমান।

আরমান শহরের ছেলে। ঢাকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, কবিতা লেখে, গল্প লেখে, মানুষকে দেখে, আবার মানুষের ভেতরেই হারিয়ে যায়। কিন্তু তার ভিতরে জমে উঠছিল এক ধূসর হাহাকারÑ নতুন কিছু, হৃদয়ছোঁয়া কিছু খুঁজে ফিরছিল সে। একদিন বন্ধুদের সাথে বেড়াতে আসে; সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে। তখনই প্রথম সে দেখে নীলাদ্রি লেকÑ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিস্ময়কর পাহাড়, যার নাম নাকি স্থানীয়দের ভাষায় “নীলাদ্রি”।

তবে গল্পটা শুধু পাহাড়ের সঙ্গে প্রেমে পড়ার নয়। গল্পটা একজন মেয়েরÑ যার নামও ছিল ‘নীলাদ্রি’।

নীলাদ্রি, যাকে আরমান প্রথম দেখে এক বিকেলে লেকের ধারে। সে ছবি আঁকছিল, হাতে ছিল রঙতুলির ছোঁয়া, চোখে যেন হাজার বছরের নীরবতা। একটা পাতলা নীল সালোয়ার-কামিজ পরা, চোখ দুটো গভীর আর মায়াবী। আরমান প্রথমে ভেবেছিল, সে হয়তো স্থানীয় কেউ, অথবা হয়তো পর্যটক। কিন্তু যখন ওর পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়, আর বলেÑ

“আপনি কি কবি?”

আরমান এক চমকে তাকায়।

“হ্যাঁ... মানে... আপনি কীভাবে জানলেন?”

নীলাদ্রি একটু হেসে বলে, “আপনার চোখে কুয়াশার মতো একটা বিষণ্নতা আছে। এটা আমি শুধু কবিদের মধ্যেই দেখি।”

সেই বিকেলেই তাদের আলাপ। সেই এক বিকেলই যেন পরিণত হয় হাজার বিকেলের ব্যথা আর ভালোবাসায়। নীলাদ্রি বলল, সে নিজে কবিতা লেখে না, কিন্তু প্রতিটি অনুভবকে আঁকতে ভালোবাসে। ছবি আঁকে, পাহাড়ে হেঁটে বেড়ায়, আর নির্জনতা ছুঁয়ে দেখে।

পরবর্তী কয়েকদিন ছিল এক স্বপ্নের মতো। তারা একসাথে হেঁটে বেড়ায় লেকের ধারে, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, বুনো ফুলের গন্ধ মেখে। আরমান তাকে তার লেখা কবিতা পড়ে শোনায়, আর নীলাদ্রি তাকে খুঁটিয়ে দেখেÑ মনে হয়, সে যেন শব্দের ভেতর ছবি আঁকে।

আরমান প্রথমবারের মতো অনুভব করে, কোনো একজন মানুষ তার লেখা পড়ে কেবল বুঝতেই পারে নাÑ তা যেন হৃদয় দিয়ে টেনে তোলে বাইরে। এমন কেউ আগে আসেনি আরমানের জীবনে।

নীলাদ্রি ছিল ধীর, অথচ গভীর। সে বলে, “ভালোবাসা আসলে ছুঁয়ে দেখার ব্যাপার না, বরং অনুভব করার।

যেমন, এই পাহাড়Ñ তুমি ওর শরীর ছুঁতে পারো না, কিন্তু ও তোমাকে ছুঁয়েই ফেলে।”

আরমান হয়তো সেদিন বুঝতেই পারেনি, নীলাদ্রি তাকে আসলে ছুঁয়ে ফেলেছে।

কিন্তু প্রতিটি স্বপ্নের একটা সময়সীমা থাকে। তাদের সময়টা ছিল মাত্র সাত দিন। আরমানকে ফিরে যেতে হবে ঢাকায়, ক্লাস আছে, জীবন আছে, দায়িত্ব আছে।

বিদায়ের দিন, নীলাদ্রি তাকে কিছু দেয় নাÑ কোনো উপহার, কোনো ঠিকানা, এমনকি কোনো নম্বরও না। শুধু বলেÑ

“আমার নামটাই তোমার জন্য রেখে দিলাম। ‘নীলাদ্রি’Ñ এই নামটা তুমি কবিতায় রেখো, গল্পে রেখো, উপন্যাসে রেখো। আমি থাকব, প্রতিটি লাইনের ভেতরে।”

আরমান তার চোখে জল দেখতে পায় না। শুধু চোখ দুটো ছিল আরও নীল, আরও গভীর। ঠিক যেন সেই পাহাড়ের মতো।

ঢাকায় ফিরে গিয়ে আরমান যেন বদলে যায়। এখন তার প্রতিটি কবিতায়, গল্পে, এমনকি নিঃশব্দ রাতেও, ফিরে ফিরে আসে সেই বিকেল, সেই পাহাড়, সেই মেয়েটা। বন্ধুদের মাঝে থেকেও তার মন থাকে বিজয়পুরের পাহাড়ে, আর শব্দের ভেতর খেলা করে একটি মাত্র নাম”Ñ নীলাদ্রি”।

সে এখন একটি বই লিখছে। নাম দিয়েছেÑ”নীলাদ্রির স্পর্শ”। সেখানে সে লিখেছে:

“তোমার ছায়া আমি ছুঁতে পারিনি, কিন্তু তোমার উপস্থিতি এখন আমার প্রতিটি কবিতার ভেতরে বাস করে।”

সমাপ্তি নয়, কারণ নীলাদ্রি এখন আর একজন নারী নয়Ñ সে এক অনুভব।

এক পাহাড়, এক কবিতা, এক হৃদয়ের ঘর।

যখনি আরমান কলম তুলে নেয়, শব্দেরা তার কাছে এসে দাঁড়ায় নীল রঙের পাহাড় হয়ে।

তখনি সে অনুভব করে...

নীলাদ্রির স্পর্শ ।