logo

গল্প

বৈশাখী মেলায় হাতির আনন্দ

গহর চাচার একটা হাতি ছিল। হাতিটি ছিল অতি বিশালাকায় ও শক্তিশালী। সেজন্যই তার নাম রেখেছিল বীরবিক্রম। তবে বীরবিক্রম ছিল খুবই শান্তশিষ্ট ও প্রভুভক্ত। বিশালাকৃতির দেহটাকে নিয়ে কাউকে কখনো ভয় দেখাত না;

Printed Edition

সুশান্ত কুমার দে

গহর চাচার একটা হাতি ছিল। হাতিটি ছিল অতি বিশালাকায় ও শক্তিশালী। সেজন্যই তার নাম রেখেছিল বীরবিক্রম। তবে বীরবিক্রম ছিল খুবই শান্তশিষ্ট ও প্রভুভক্ত। বিশালাকৃতির দেহটাকে নিয়ে কাউকে কখনো ভয় দেখাত না; কিংবা কারোর সাথে বড়াই করত না। গহর চাচার ইশারা ছাড়া বীরবিক্রম এক পা চলত না, কাউকেই কিছুই বলত না।

মাঝে মাঝে গ্রামের সরু সরু রাস্তা দিয়ে যখন বীরবিক্রম হেঁটে যায়, তখন উৎসুক মানুষেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো সুবিশাল জন্তুটিকে । গহর চাচা তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, যেন এক ইশারায় সে বুঝে নেয়। গহর চাচার ইশারায় বীরবিক্রম মানুষের কাছে টাকা চায়। দশ টাকা দিলে নিতে চায় না। পঞ্চাশ টাকার একটা নোট দিলে বীরবিক্রম তার মোটা শুঁড় বাড়িয়ে তুলে নিয়ে মাহুত গহর চাচার হাতে দেয়।

সামনে বৈশাখী মেলা, বীরবিক্রমের খুব আনন্দ হচ্ছে। নববর্ষের শোভাযাত্রায় বীরবিক্রম আমন্ত্রিত অতিথির মধ্যে একজন। সে কারণেই মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে। শত শত মানুষের ভিড়, তাদের মাঝেই সামনের সারির শোভাযাত্রায় যোগ দিতে হবে। নববর্ষের দিনে বীরবিক্রমকে অতি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলে। নবাবের মতো বীরবিক্রম পথ চলতে থাকবে। তার পিছনে হাজার হাজার মানুষ সুসজ্জিতভাবে হেঁটে যাবে। এদিন বেশ মজার মজার খাবার জুটবে। টাটকা কলা, কলা গাছের থোড়, কচি বাঁশের মাথি, ডাব, নারকেল, বেল আরও কত খাবার খেতে দেয় মানুষেরা।

বৈশাখী মেলায় কত মানুষ হয়, অনেকেই খাবার কিনে বীরবিক্রমকে খেতে দেয়। এ বছরও খুব মজা করে খাওয়া দাওয়ায় ধুমধাম পড়ে যাবে। সেই কারণে বীরবিক্রম, নববর্ষের দিনটির অপেক্ষায় চেয়ে থাকে। গত বৈশাখী মেলার একটা স্মরণীয় ঘটনা বীরবিক্রমের খুবই মনে পড়ে। দশ বছরের একটা ছোট মেয়ে কাগজের ঠোঙায় বাদাম ভাজা কিনে বীরবিক্রমকে দিতে এসেছিল। বীরবিক্রম, খুশি হয়ে মেয়েটিকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে আদর করছিল। মেয়েটি ভয়ে সে কী কান্না করছিল! গহর চাচা, তাকে ছেড়ে দিতে বলল। বাদামগুলো শুঁড়ে ধরে কিছুটা নাচতে ইচ্ছে করছিল বীরবিক্রমের। অবশেষে গহর চাচার হাতে পৌঁছাল বাদামের ঠোঙাটা। বীরবিক্রমের কাঁধে বসে কুটুস কাটুস করে বাদামগুলো খেতে লাগলেন গহর চাচা।

মেলায় এক স্থানে বেশিক্ষণ থাকতে বীরবিক্রমের ভালো লাগে না। অনেক মানুষের ভিড়ে তার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। বীরবিক্রম সবাইকে ভালবাসতে চায়, অথচ মানুষেরা তাকে ভয় পেয়ে অনেক দূরে সরে যায়। বীরবিক্রম সবাইকে বলতে চায়, সে তো জঙ্গলের কিংবা পাহাড়ের হাতি নয়। সে কখনো মানুষের ঘর ভাঙে না, গাছপালা উপড়ে ফেলে না। মানুষকে ধরে আছাড় মেরে হত্যা করে না। সে তো মানুষকে ভালবেসে মানুষের পাশে থাকতে চায়। ইতিমধ্যেই বীরবিক্রমকে এবছরও নববর্ষের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য গহর চাচার সাথে চুক্তিবদ্ধ হল। বীরবিক্রমও মহাখুশিতে নাচতে থাকে। নববর্ষের শুভলগ্নে বীরবিক্রমকে মনের মতো সাজিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে শোভাযাত্রায় বেরিয়ে পড়ল গহর চাচা। নানান রঙের ফেস্টুন, বিভিন্ন ধরনের কার্টুন নিয়ে তার পিছনে অনেক মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। সেই সাথে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোভাযাত্রাটি শহরের বড় বড় গলি দিয়ে প্রবেশ করবে। বীর বিক্রম আনন্দে নাচতে লাগলো । তাকে আজ কেউই ভয় পাবে না। এদিন সকল শ্রেণির মানুষেরা বীরবিক্রমের গা ঘেঁষে দাঁড়াতে চাইবে। ছোট একটা মেয়ে টুসি, সেও সাহস করে বীরবিক্রমের শুঁড়টা ধরে নাড়াচাড়া করে দেখছে,আর শুঁড়টি জড়িয়ে আদর করছে। অনেকে বীরবিক্রমের গলায় ফুলের মালা গেঁথে পরিয়ে দিচ্ছে । কেউবা টাকার মালা গেঁথে তার শুঁড়ে বেঁধে দিচ্ছে। আহ্ কী যে আনন্দ! এজন্যই বুঝি বীরবিক্রম নববর্ষের দিনটিকে বার বার স্মরণ করে।