logo

কলাম

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ে প্রভাব পড়বে কি বাংলাদেশে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সেখানে বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন-বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ে বাংলাদেশের ওপরও নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

Printed Edition

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সেখানে বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন-বিশেষ করে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয়ে বাংলাদেশের ওপরও নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর জয়ে দীর্ঘদিন পর পশ্চিমবঙ্গের গেরুয়া শিবির উম্মত্ত হয়ে ওঠছে। দীর্ঘ পনের বছর পর মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের হেরে যাওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না দলটির শীর্ষ নেতারা। ইতোমধ্যে তৃণমূল নেত্রী ক্ষমতা না ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন-এই নির্বাচনে তারা হারেনি। বিজেপি ও তৃণমূল শিবিরে নির্বাচনের পর থেকেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তবে এসবের মধ্যে সব চেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ইতোমধ্যে মুসলমানদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ করছে বলে বেশ কয়েকটি অভিযোগ গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। এই আতঙ্ক শুধু ওপারের পশ্চিম বঙ্গেই নয়- বাংলাদেশের সংখ্যা লঘুরাও উদ্বিগ্ন। যদিও বাংলাদেশ বরাবরই সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির দেশ হিসেবে পরিচিত। এ দেশের সংখ্যালঘুরা সবসময়েই নিরাপদে বসবাস করছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিজেপির প্রভাব ইতোমধ্যেই শক্তিশালী। পশ্চিমবঙ্গে দলটি ক্ষমতায় আসায় শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। আর এতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা আনতে পারে। বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি অনেকাংশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবা সংঘের (আরএসএস) ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত, যা জাতীয়তাবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যুকে গুরুত্ব দেয় বলে দাবি করে। তবে আরএসএস-এর কট্টর মনোভাবের কারণে সংখ্যালঘু এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। আরএসএস যদি তাদের এই মনোভাব পশ্চিমবঙ্গেও বজায় রাখে তবে শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস বা টিএমসি নিজেরাই বলেছে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ হবে-‘টেম্পল-মস্ক-চার্চ’। অর্থাৎ মন্দির, মসজিদ এবং গির্জা। ভারতের সম্প্রীতি, ধর্মীয় ঐক্যের প্রতিভূ। কয়েক বছর আগে নতুন নাম দিয়েছিলেন দলটির প্রধান মমতা ব্যানার্জি। তিনি বলেছেন, টিএমসি আর এখন শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়। তিনি বলেছেন, আমি দুর্গাপূজো করি, গণেশ চতুর্থী পালন করি। আবার রমযানেও থাকি। চার্চে গিয়ে প্রার্থনাও করি। তৃণমূল বিভেদের রাজনীতি করে না। আর যারা করে তাদের সঙ্গে সমঝোতাও করে না। কিন্তু এবারের নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূল এখন কি করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতা না ছাড়ার ঘোষণা দেয়ায় সেখানে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। এসব কারণে শুভেন্দু অধিকারীর দল বিজেপি আরো ক্ষ্যাপাটে হয়ে বিভিন্নস্থানে সহিংসতা সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন- এর প্রভাব যে বাংলাদেশে কতটা পড়তে পারে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রধান অমীমাংসিত চুক্তির মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অন্যতম। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বা ঝুলে থাকা চুক্তিগুলোর মধ্যে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ছাড়াও পশ্চিম বঙ্গের সাথে বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় এখনও চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি এবং ট্রানজিট সংক্রান্ত প্রটোকলগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় বা পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার চেষ্টা চলে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে কিছুটা শীতল সম্পর্ক চলছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক যে খুব উষ্ণ ছিল তা বলা যাবে না। বিশেষ করে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনুসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের দূরত্ম ছিল। যে কারণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তা বাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ-ভারত নতুন সম্পর্কের সূচনা ঘটে। এই সম্পর্ক সৃষ্টির শুরুর দিকেই পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিম বঙ্গের সরকার পরিবর্তন হওয়ায় এর ধারাবাহিকতা সামনে এগোয় কিনা তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যদিও এরই মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন- পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলেও এতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। গত মঙ্গলবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সবক্ষেত্রে একই থাকবে। ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির ভিত্তিতেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে। ভারতে যে সরকারই আসুক না কেন, এর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। অন্যদিকে ভারতে যে দলই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসুক না কেনো বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক একই থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। মঙ্গলবার রাজধানীর জিয়া উদ্যানে কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে সাথে নিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এ কথা বলেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ভারতে কোন দল ক্ষমতায় এলো তা দেখার বিষয় নয়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি, তাই যেই ক্ষমতায় আসুক না কেনো সম্পর্ক একই থাকবে। ভারতের জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নেতা নির্বাচন করেছেন, নির্বাচিতদের আমি অভিনন্দন জানাই। এছাড়া বুধবার এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন-ভারত থেকে নতুন করে পুশ ইন হলে বর্ডারর্গার্ড বাংলদেশকে (বিজিবি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর যদি ‘পুশ ইন’-এর ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে ঢাকা সফররত উচ্চপর্যায়ের একটি মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

শুভেন্দুর রাজনৈতিক গুরু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত মাসে কুচবিহারে প্রচারের সময় বলেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা থেকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ নাম সরালে বিজেপি তাদের ‘বাংলার মাটি’ থেকেই সরিয়ে দেবে। তার এ বক্তব্য লাখ লাখ মানুষের মনে ভয়ের সৃষ্টি করছে, আতঙ্ক ছড়িয়েছে। যাদের আবেদন ট্রাইব্যুনালে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে তারা এখন চরম অনিশ্চিত জীবনের মুখে পড়বেন। যদিও তৃণমূলের পনেরো বছরের শাসনে মমতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কখনো কোনো উৎসাহ দেখাননি। শুভেন্দু অধিকারীর শাসনে পুশ ইনের ব্যাপকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের ওপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তারে বা চাপ প্রয়োগে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফকে উসকে দেওয়ার আভাস শুভেন্দু দিয়েছেন বিরোধী নেতার আসনে বসেই। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ১ তারিখে শুভেন্দু যে বক্তব্য দেন, তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদের বার্তা দেয়। ওইদিন যাদবপুরে এক বক্তব্যে শুভেন্দু বলেন, মমতার সরকার বিএসএফকে জমি দেয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় আসলেই এক মাসের মধ্যে জমি দেবে বিএসএফকে। এক কোটি রোহিঙ্গাকে খুঁজে খুঁজে বের করে বাংলাদেশে পাঠাব। ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি করা বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে একই দিন শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আদানি চাইলে এক্ষুনি বাংলাদেশের ৮০ ভাগ অন্ধকারে ডুবে যাবে। প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ফালাকাটা, গার্ডেনরিচের বদলা আমরা নেব।

বিশ্লেষকরা মনে করেন- বাংলাদেশ সরকারের এসব আগাম সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। কেননা বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উষ্ণ নাকি শীতল হবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আগে থেকেই শতর্ক থাকা জরুরি। বিগত ১৫ বছরে তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী ক্ষমতায় থাকায় পশ্চিমবঙ্গের সাথে একধরনের ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক কতটা উষ্ণ বা শীতল ছিল সেই প্রশ্নের চেয়ে কোনো ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়নি। ২৪ এর অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলেও তৃণমূল সরকার বিষয়টি দুই দেশের কারো পক্ষে বিপক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান করেনি। বাংলাদেশ থেকে কয়েক ডজন আয়ামী লীগ নেতা দেশটিতে আশ্রয় নিলেও তাদেরকে প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দেয়ার ঘেষাণা দেয়নি। এছাড়াও দীর্ঘ দিন ধরে মমতা ক্ষমতায় থাকাকালে তিস্তাসহ কয়েকটি চুক্তি ছাড়া প্রকাশ্যে বাংলদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেয়নি। অথচ সাম্প্রতিক নির্বাচনে বেজেপি নেতা শুভেন্দু ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যুতে হুঙ্কার দিয়ে আসছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার বসার ফলে সীমান্তের দু’পাশের জনগণের মধ্যে উত্তেজনা ও অস্থিরতা বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা আরো অনিরাপদ হয়ে পড়বেন। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের মধ্যেও নানামাত্রিক প্রভাবের শঙ্কা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে বড় অংকের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের পরিধিও ব্যাপক। পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যে বাণিজ্য প্রবাহ, তা দু’দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের আর্থসামাজিক লাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিজেপি সরকার যদি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি আরোপ করে, তাহলে এ বাণিজ্যিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বিধানসভার ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের ৬০ লাখেরও বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বাদ দেওয়া ওই ভোটারদের বলা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। বাদপড়াদের বড় অংশই মুসলিম। নির্বাচনে মততার তৃণমূল কংগ্রেসের জন্যে এটা যে বড় ধরনের ফাঁড়া হয়ে দেখা দেবে তা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। এ নিয়ে কয়েক মাস ধরে তীব্র বিতর্ক চলছিল বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে। তৃণমূল বলছিল, বাদ পড়ারা তৃণমূলের ভোটার এবং মোদি সরকার বেছে বেছে বিশেষ গোষ্ঠীর (মুসলিম জনগোষ্ঠীর) লোকদের বাদ দিয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ও প্রক্রিয়াধীন মোট এক কোটি মানুষ বাংলাদেশের জন্যে বিপদের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আসামসহ ভারতের অন্যান্য বিজেপিশাসিত অঞ্চলে গত এক বছরে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে কাগজপত্র না থাকার অজুহাতে অবৈধ ঘোষণা করে দলে দলে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার একই পথে হাটলে তা বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদের কারণ হবে নির্ঘাত। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ৬০ লাখ পশ্চিমবঙ্গবাসীকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দেশটিতে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো কথিত ‘অবৈধদের’ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে-পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক উত্তেজনার সঙ্গে জড়িত। সাম্প্রতিক নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের অনুভূতি তৈরি করেছে-এমন দাবি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে উঠে এসেছে। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিন, অর্থাৎ সোমবার রাত থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করে সহিংসতার খবর। ভোটের ফল প্রকাশের পর রাত থেকেই কলকাতাসহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর শুরু করে বিজেপি সমর্থকরা, হামলা হয়েছে তৃণমূল কর্মীদের ওপরও। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, এমনকি হত্যাকান্ডেরও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, বিজয় মিছিলকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে। তারা বলছেন বিজেপি ক্ষমতায় আসতে না আসতেই মুসলিমদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়ে গেছে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক।