logo

কলাম

ডিজিটাল প্রতারণা উদ্বেগজনক

“বিশ্ব জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘সংকল্প’ কবিতার এই পঙক্তিটির মাধ্যমে মানুষের অসীম শক্তি ও মেধার জয়গান গাওয়া হয়েছে।

Printed Edition

॥ এডভোকেট মো. তোফাজ্জল বিন আমীন ॥

“বিশ্ব জগৎ দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘সংকল্প’ কবিতার এই পঙক্তিটির মাধ্যমে মানুষের অসীম শক্তি ও মেধার জয়গান গাওয়া হয়েছে। মানুষ চাইলে সমস্ত বাধা পেরিয়ে পুরো বিশ^কে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারে। আজ মানুষ ঘরে বসে পৃথিবীর একপ্রাপ্ত থেকে অপর প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে নিতে পারছে। ১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল প্রথম কার্যকরী টেলিফোন আবিষ্কার করে পৃথিবীবাসীকে চমকে দিয়েছিলেন। এরপর ল্যান্ডলাইন টেলিফোন, কর্ডলেস এবং পরবর্তীতে স্মার্টফোন আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এর সুফল অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এসব প্রযুক্তির অগ্রযাত্রাকে খাটো করার বা সমালোচনা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার যেভাবে বাড়ছে তা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। বাটন ফোনের সেই দিনগুলোর কথা নিশ্চয়ই পাঠকের মনে আছে, যখন পুরো গ্রামে হয়তো মাত্র একজনের কাছে একটি ফোন থাকতো; তাও আবার অ্যান্টেনা লাগিয়ে নেটওয়ার্ক খুঁজতে হতো। কিন্তু আজ চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ঘরে ঘরে এখন ডিজিটাল স্মার্টফোন। দশ বছরের শিশু থেকে শুরু করে আশি বছরের বৃদ্ধ-সবার হাতেই আজ স্মার্টফোন শোভা পাচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করা বা স্মার্টফোন থাকা কোনো অপরাধ নয়। এই ডিজিটাল স্মার্টফোনের আড়ালে বর্তমানে ডিজিটাল প্রতারণার এক মহোৎসব চলছে। বিবেকের তাড়না এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বেশ কিছু লোমহর্ষক ঘটনা পড়ার পর নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না।

মূলত ডিজিটাল প্রতারণার ৩টি মারাত্মক দিক নিয়ে আলোচনা

১. ডিজিটাল অনলাইন জুয়া : ডিজিটাল অনলাইন জুয়া হলো ইন্টারনেট, মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করে অর্থ দিয়ে বাজি ধরে জুয়া খেলার একটি আধুনিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ। আগেরকার দিনে জুয়া বলতে নির্দিষ্ট কোনো আসরে তাস, লুডু বা ক্যারাম খেলাকে বোঝাতো; কিন্তু বর্তমানের ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে তা এখন পুরোপুরি মোবাইল স্ক্রিন বা ভার্চুয়াল জগতে চলে এসেছে। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস (যেমন- বিকাশ, নগদ, রকেট) এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে খুব সহজে এই জুয়ার টাকা জমা ও উত্তোলন করা যায়। এটি দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিয়মিত সাইট বন্ধ করা এবং টাস্কফোর্স পরিচালনা করলেও এর বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং মানুষের মানসিক শান্তি নষ্ট করে এবং অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যার মতো মারাত্মক পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। পত্র-পত্রিকায় এ ধরনের খবর প্রায়ই দেখা যায়। কিছুদিন আগে আমার পরিচিত এক ব্যক্তি অনলাইন জুয়ার ভয়ঙ্করতা নিয়ে লেখার অনুরোধ জানান। লেখার স্বার্থে তার কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনলাম, যার সারমর্ম সত্যিই লোমহর্ষক। ওই ভদ্রলোকের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান নানুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে তার মামাতো ভাইয়ের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিষয়টি জানতে পারে। এরপর বাড়িতে এসে নিজের মোবাইল দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতিদিন অনলাইন জুয়া খেলতে শুরু করে যা পরিবারের কেউ টের পায়নি। একদিন ভদ্রলোকের নিজস্ব বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু টাকা কেটে যায় এবং পরবর্তীতে আবার কিছু টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়। কিন্তু তিনি শুরুতে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। কিছুদিন পর তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে অনেক বড় অঙ্কের টাকা উধাও হয়ে যায়। তখন তিনি থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে, নিকটস্থ থানা মামলা না নিয়ে বলে জেলা শহরে গিয়ে সাইবার ক্রাইম বা আইসিটি আইনে মামলা করার পরামর্শ প্রদান করে। কিন্তু তিনি জেলা শহরে না গিয়ে বাড়িতে এসে নিজেই অনুসন্ধান করে দেখতে পান যে, তারই কলিজার টুকরা সন্তান অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে! সন্তানকে চাপ দেওয়ার পর সে সব ঘটনা খুলে বলে। এ ধরনের ঘটনা যেকোনো পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্নের চেয়েও ভয়ঙ্কর। দেশের আইন অনুসারে অনলাইন জুয়া বা বেটিং সম্পূর্ণ অবৈধ ও দ-নীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও এর বিস্তার থামছে না। আজকের দিনের শিশুরা যদি এভাবে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে জীবনকে অন্ধকারে মিশিয়ে দেয়, তবে আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

২. মোবাইল অ্যাপ ঋণের ভয়ঙ্কর ফাঁদ : দ্বিতীয় পয়েন্টটি হলো মোবাইল অ্যাপ ঋণের ভয়ঙ্কর ফাঁদ। সম্প্রতি দেশের জাতীয় কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ‘মুঠোফোনের ঋণের ভয়ঙ্কর ফাঁদ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম চালানো অন্তত ৩০টি অবৈধ অ্যাপের উল্লেখ করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে সহজে ঋণ পাওয়ার আশায় সাধারণ মানুষ এসব মোবাইল অ্যাপের দ্বারস্থ হচ্ছে এবং লোভের বশবর্তী হয়ে ঋণ নিয়ে অধিকাংশই মারাত্মক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এই অপরাধচক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। ঋণের আবেদন করার সময় তারা গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, মুঠোফোনের কন্টাক্ট লিস্ট, ব্যক্তিগত ছবি ও এমএফএস অ্যাকাউন্টের গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নেয়। এরপর নামমাত্র কিছু টাকা গ্রাহকের মোবাইলে ঋণ হিসেবে পাঠিয়ে ফাঁদে ফেলে।

বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, মি কামাল ‘ফিন ক্যাশ বা দ্রুত ক্যাশ’ থেকে জরুরি প্রয়োজনে ৫ হাজার টাকা ঋণ নিলেন। ঋণ নেওয়ার সময় সুদের হার বা টার্মস সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। অথচ কিছুদিন পর যখন তিনি মূল ৫ হাজার টাকা পরিশোধ করতে যান, তখন চক্রটি দাবি করে যে তাকে ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ঋণের বিপরীতে অস্বাভাবিক সুদ, সার্ভিস চার্জ ও নানা ধরনের হিডেন চার্জ চাপিয়ে দেওয়া হয়। টাকা পরিশোধ করতে সামান্য দেরি হলেই শুরু হয় গ্রাহককে মানসিকভাবে হেনস্তা করা, হুমকি-ধমকি দেওয়া এবং তার ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইফনিট (BFIU) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সহজ শর্তে দ্রুত ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো অনুমোদনহীন মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল ঋণের কার্যক্রম থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকার জন্য ৪টি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছে : ১. কোনো মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে চটকদার বিজ্ঞাপন প্রলুব্ধ হয়ে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা। ২. প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ শাস্তিযোগ্য অপরাধ জেনেই এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত না হওয়া। ৩. অপরিচিত কোনো অ্যাপ বা প্লাটফর্মে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব বা মুঠোফোনের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য না দেওয়া। ৪. ঋণ দেওয়ার আগে অগ্রিম অর্থ, নিবন্ধন ফি বা প্রসেসিং ফি দাবি করা হলে তৎক্ষণাৎ সতর্ক হওয়া। বিএফআইইউর নজরে আসা অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপগুলোর মধ্যে রয়েছে- সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেরয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাড়ি, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকা নাও। উপরোক্ত অ্যাপগুলো জরুরী ভিত্তিতে বন্ধ করা প্রয়োজন। যেন আর কোন মানুষ প্রতারণার শিকার না হয়।

৩. আঙুলের ছাপ চুরির মাধ্যমে অবৈধ সিম বাণিজ্য : ডিজিটাল প্রতারণার আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক চুরির মাধ্যমে অবৈধ সিম বাণিজ্য। একসময়ে একটি সিম কার্ড কেনা মানে ছিল যেন সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো। ১৯৯৩ সালে দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটির সিটিসেলের সংযোগ নিতে ১ লাখ টাকারও বেশি খরচ হতো। ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন যখন প্রথম সিম কার্ডভিত্তিক সেবা চালু করে তখন সর্বনি¤œ মূল্য ছিল ১৮,১০০ টাকা এবং এর সাথে জামানত দিতে হতো আরও ৫০০০ টাকা। পরবর্তীতে একক সিম কার্ডের অফিশিয়াল দাম ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ যত্রতত্র, মেলায় কিংবা রাস্তার পাশে হকারদের মাধ্যমেও সিম বিক্রি করতে দেখা যায়। আর এই সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অপরাধের নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি রাজধানীর লালবাগে ডিবি পুলিশের অভিযানে ২২ হাজার সচল সিমসহ চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারের ঘটনা জনমনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের আঙুলের ছাপ ক্লোন করে বা অজান্তে এশাধিকবার স্ক্যান করে হাজার হাজার সিম অবৈধভাবে সচল করা হচ্ছে। কিছু অসাধু রিটেনলার নানা অজুহাতে গ্রাহকের অজান্তেই তার আঙুলের ছাপের হুবহু ক্লোন বা ডিজিটাল ইমেজ তৈরি করে নিচ্ছে। এরপর সেই ক্লোন করা বায়োমেট্রিক ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একের পর এক সিম সচল করা হচ্ছে, যা এক ভয়ঙ্কর ডিজিটাল জালিয়াতি। বাজারে বিক্রি হওয়া এসব অবৈধ সিমের মাধ্যমে পরবর্তীতে অর্থ আত্মসাৎ, আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালন, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচারসহ নানা রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে।

প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে আমাদের জীবন যেমন সহজ ও গতিশীল হয়েছে, তেমনি এর কালো ছায়া হয়ে আমাদের সমাজ জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদের শিকার হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার মরণফাঁদ, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অবৈধ ঋণের চক্র এবং আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করে সিম বিক্রির মতো অপরাধগুলো আজ আমাদের সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। আমাদের কোমলমতি শিশুরা যখন এই ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়ে অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত হয় তখন তা সমগ্র জাতির জন্য এক চরম উদ্বেগের বিষয়। কেবল সচেতনা বাড়িয়ে কিংবা দায়সারা সতর্কতা জারি করে এই সর্বগ্রাসী অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি, আইন লঙ্ঘনকারীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা অবৈধ বিজ্ঞাপনগুলো শক্ত হাতে দমন করা। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেককেই সচেতন হতে হবে, যাতে সামান্য লোভ বা প্রলোভনে পড়ে নিজের সংবেদনশীল তথ্য প্রতারকদের হাতে তুলে না দিই। একটি নিরাপদ, অপরাধমুক্ত ও ডিজিটালবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এখনই সম্মিলিতভাবে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।