logo

কলাম

পাহাড়ে মরণফাঁদ

বর্ষা এলেই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে মৃত্যুর মিছিল। কর্দমাক্ত মাটির নিচে চাপা পড়ে নিমিষেই শেষ হয়ে যায় একেকটি স্বপ্ন।

Printed Edition

বর্ষা এলেই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামের পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসে মৃত্যুর মিছিল। কর্দমাক্ত মাটির নিচে চাপা পড়ে নিমিষেই শেষ হয়ে যায় একেকটি স্বপ্ন। আমি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত পত্রিকার খবর অনুযায়ী ভারী বৃষ্টির ফলে প্রায় ২৯ জন মানুষ পাহাড়ধসে মৃত্যুবরণ করেছেন। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখনও হয়তো মৃত্যুর মিছিলে আরও সংখ্যা বাড়বে। আমরা কেউই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ুক তা চাই না। কিন্তু মানবসৃষ্ট ঘটনায় অকাতরে ঝরে যাচ্ছে একের পর এক প্রাণ। যার শিকার মূলত পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালু অংশে বসবাসকারী সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা। তারা জীবনের চরম ঝুঁকি জেনেও পাহাড়ের বুকে রাত কাটায়। ফলে বর্ষার বাদলে জীবনের আলো নিভে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা, রেল দুর্ঘটনা, নৌ দুর্ঘটনার মতোই পাহাড়ধসে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু এসব মৃত্যুর ঘটনা এখন আর কাউকে আলোড়িত করে না; সবই যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। অথচ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। পাহাড়ধস শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ তা কিন্তু নয়; এটি আমাদের নিজেদের হাতের কামাই। আমরা একদিকে উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি। অপরদিকে নিজেদের ঠুনকো স্বার্থে নদী ভরাট করছি, নির্বিচারে গাছ কাটছি, আর তার বিনিময়ে পাচ্ছি তীব্র দাবদাহ, অপরিকল্পিত বন্যা, জলাবদ্ধতা আর বায়ুদূষণ। বন, নদী কিংবা পাহাড় ধ্বংস করে হয়তো আমরা সাময়িক কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি খেসারত মনের অজান্তে দিচ্ছি। প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো স্থায়ী উন্নয়ন হয় না; বরং এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। প্রকৃতি আমাদের ছাড়া চলতে পারলেও আমরা প্রকৃতি ছাড়া অচল। প্রকৃতি মহান আল্লাহ তা’আলার অশেষ নিয়ামত। গাছপালা, নদী-নালা, পাহাড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত আমানতের খেয়ানত করছি। কোন কিছু অপচয় বা ধ্বংস করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। প্রকৃতি ও পাহাড় সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আরাফ, আয়াত ৭৪ এ বর্ণনা করেছে যে, ‘‘এবং তোমরা সমতল ভূমিতে অট্টালিকা নির্মাণ করছো এবং পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করছ। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ স্মরণ করো এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’’ এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা পাহাড় কেটে যথেচ্ছ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন এবং একে পৃথিবীতে বিপর্যয় বা ফাসাদ সৃষ্টির সমতুল্য বলে ঘোষণা করেছেন।

ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা মৃত্যুর সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এই মানবিক সংকটের অন্যতম কারণ দারিদ্র্য ও ছিন্নমূল মানুষ। তারা পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ার নিশ্চিত মরণফাঁদ জেনেও আর্থিক দৈন্যদশার কারণে বিপজ্জনক জায়গায় বসবাস করছে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা অস্থায়ীভাবে ঘরবাড়ি তুলে নিজেদের পকেট ভারী করছে। পাহাড়ের পাদদেশে বা ঝুঁকিপূর্ণ ঢালু অংশে যেসব অস্থায়ী ঘরবাড়ি তোলা হয়, সেগুলোর মালিক কোনো সাধারণ মানুষ নন; বরং সিংহভাগেরই নিয়ন্ত্রক হচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগী চক্র। ক্ষমতা ও সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই চক্রটি রাতারাতি নিজেদের রূপ বদলে ফেলে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কয়েকদিন পর সেখানে আবার আগের মতোই বসতি গড়ে উঠে। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি। ফলে পাহাড়ি জনপদের মানুষকে প্রকৃতির এই নির্মম প্রতিশোধের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দেশে এ পর্যন্ত যতগুলো পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগই চট্টগ্রাম মহানগরী ও এর আশেপাশের এলাকায় সংঘটিত হচ্ছে। একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী কেবল চট্টগ্রাম মহানগীর ভেতরেই অন্তত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে। যার পাদদেশে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার পরিবারের ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করছে। আর যদি রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়গুলোতে বসবাসকারী মানুষের হিসাব করা হয় তাহলে সেই সংখ্যা অনায়াসেই কয়েক লক্ষে গিয়ে ঠেকবে।

দেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও মানবিক অধিকারের স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া থাকলেও পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী নিম্নআয়ের দিনমজুর, নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ কিংবা গৃহহীন ছিন্নমূল মানুষগুলোর নাগরিক অধিকার কার্যত শূন্যের কোঠায়। অথচ তারাও আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। এই মানুষগুলো কিন্তু শখ করে নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদে ঘুমাতে যায় না। এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র, ভূমিদস্যু এবং কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তার অশুভ আঁতাত। তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যেকোন মুহূর্তে অবৈধভাবে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দিতে পারে। সেই আইনি ক্ষমতা সরকারের আছে। কিন্তু পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করে কেবল উচ্ছেদ করলেই কি সমাধান মিলবে? নিশ্চয়ই না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়ন করা। তা না হলে প্রতিবছরই বর্ষার মৌসুমে আকাশে মেঘ জমবে, পাহাড়ধসে বাতাসে স্বজনহারাদের কান্নার আওয়াজ ভাসবে, গণমাধ্যমে বড় বড় শিরোনাম হবে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু বেদনাদায়ক ছবি পোস্ট করে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব শেষ হবে- ব্যস। ওই পর্যন্তই শেষ! পাহাড়ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ঠিক কতজন প্রাণ হারিয়েছেন তার নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। কারণ দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির হিসাব রাখা হলেও পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে কতজন মারা যান, তাদের সংখ্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল তালিকায় আর যুক্ত হয় না। আর তাদের খবর নেওয়ার ফুরসত কারও থাকে না। তবুও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত গত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩১২ জন। বছরওয়ারি এই মৃত্যুর সংখ্যা অত্যন্ত শিউরে উঠার মতো- ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ সালে ৫ জন, ২০১০ সালে ৬২ জন, ২০১২ সালে ২৯ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ২৬ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ২৯ জন, ২০২২ সালে ২৫ জন, ২০২৩ সালে ৬ জন, ২০২৪ সালে ১০ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে প্রায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো আমরা ভুলে যাব। কিন্তু এককটি পরিবারের কাছে এগুলো কোনো একটি সংখ্যা নয়। বিশেষ করে যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি মাটির নিচে চাপা পড়ে আল্লাহর জিম্মায় চলে যান তখন সেই পরিবারটির উপর দিয়ে বয়ে যায় সিডর কিংবা আইলার চেয়েও ধ্বংসাত্মক এক অদৃশ্য টর্নেডো। পাহাড়ের পাদদেশে লাশের এই দীর্ঘ মিছিল আর কত বড় হলে রাষ্ট্রের টনক নড়বে?

বিশ্বের বহু দেশেই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। এর অন্যতম বড় উদাহরণ হংকং। ১৯৭০ সালে হংকংয়ে পাহাড়ধসে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। অথচ আজ দেশটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বের বুকে এক রোল মডেল। তারা ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর ঢালকে কংক্রিটের আস্তরণে মুড়িয়ে মাটির গভীরে লোহার রড ঢুকিয়ে পাহাড়ের ভিত্তিকে এমনভাবে শক্ত করেছে, যাতে বর্ষার ভেতরে পানি ঢুকতে না পারে। পাহাড়ে বসানো হয়েছে স্বয়ংক্রিয় সেন্সর, যা মাটির সামান্যতম নড়াচড়া টের পেলেই নিয়ন্ত্রণকক্ষে সর্তক সংকেত পাঠায়। তাছাড়া পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে সুপরিকল্পিত নিষ্কাশন নালা, যাতে বৃষ্টির পানি জমে না থেকে দ্রুত নেমে যেতে পারে। একইভাবে জাপানের প্রযুক্তির দিকেও নজর দেওয়া যায়। দেশটি চরম ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে বিশেষ ধরনের ছোট ছোট বাঁধ বা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করেছে। ফলে পাহাড় ধসে পড়লেও এই বাঁধগুলো মাটিকে আটকে দিয়ে নিচের লোকালয়কে সুরক্ষিত রাখে। এই দেশগুলো যদি পাহাড়ধসের হাত থেকে তাদের নাগরিকদের রক্ষা করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? আমাদেরও সেই সামর্থ্য আছে। শুধু অভাব রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তরিক উদ্যোগের। পাহাড়ের বসতি বন্ধে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন পাহাড় রক্ষায় কঠোর আইনের প্রয়োগ-যেন কোনো ভূমিদস্যু সেখানে নতুন করে থাবা বসাতে না পারে। পাহাড়ধসের এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর মিছিল আমরা আর দেখতে চাই না। সরকার পাহাড়ের বুক থেকে কান্নার রোল চিরতরে মুছে দিতে একটি বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটবে, এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।