logo

কলাম

শহীদ আবু সাঈদ

শহীদ আবু সাঈদ ২০০১ সালে রংপুর জেলায় পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া গ্রামে মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের ঘরে জন্ম হয় এক বীরের। বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন মিলে তার নাম রাখে আবু সাঈদ। আবু সাঈদের ছয় ভাই ও তিন বোন ছিল, নয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

Printed Edition

মুহাম্মদ ইসমাঈল

শহীদ আবু সাঈদ ২০০১ সালে রংপুর জেলায় পীরগঞ্জ উপজেলার জাফরপাড়া গ্রামে মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের ঘরে জন্ম হয় এক বীরের। বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন মিলে তার নাম রাখে আবু সাঈদ। আবু সাঈদের ছয় ভাই ও তিন বোন ছিল, নয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের আশা জাগিয়ে তুলেছিলেন। আবু সাঈদ একটি বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা ও পরিবারের ছোট সন্তান হওয়ার সুবাদে তার বাবা-মা ও ভাই-বোনের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণার একটি উৎস ছিল। তারা তাঁর শিক্ষা ও মানসিক উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। এই প্রেরণার মাধ্যমেই তিনি বেঁচে থাকার সাহস খুঁজতেন। তার বাব- মা ও পরিবারের সবাই আনন্দিত ছিল তাঁর এই মেধার বিকাশ দেখে। তিনি একজন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণ ছিলেন। মেধাবী পারিবারিক অসচ্ছলতা সত্যেও সরকারিভাবে তিনি কখনো কোন সাহায্য- সহযোগীতা পাননি। আর প্রতিটি পদে পদে কোটামূলক বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন এই স্বাধীনতার সূর্যোদয় উপহার দেয়া সাহসী আবু সাঈদ। তাই একসময় তার উচ্চতর পড়াশোনা করার মধ্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। তাই বাধ্য হয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনিও করতে হয়েছিল যুবক আবু সাঈদের। কেননা পারিবারিক অবস্থা নিম্নশ্রেণীর হওয়ায় সেই থেকেই সংসার চালনার ভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নিতে হয়েছিল। কখনো বা ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে চৌচির হতো। আর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসার উপক্রম হতো। কেমন যেন তিনি নিজেকে জীবিত থেকে মৃত অনুভব করতেন। আবু সাঈদ একটি বড় পরিবারে বেড়ে উঠার সুবাদে তাকে প্রেরণা দেয়ার অনেক আপনজন পেয়েছিলেন, যেটি তার জীবনের জন্য সহজতা তৈরি করছিল। তারা তার শিক্ষা ও মানসিক উন্নয়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলন: শহীদ আবু সাঈদ ২৪’র কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন সৎসাহসী বৈষম্য মুক্তিকামী যোদ্ধা। ২০১৩ ও ১৮ সালের পর ২৪-এর ৬ জুন আবারও কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু হয়।

তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক হিসেবে এই ছাত্রআন্দোলনে যোগ দেন। তিনি রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রংপুর অঞ্চলে কোটা সংস্কার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেখানে আবু সাঈদ সক্রিয়ভাবে প্রথম সারির ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একযোগে এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৫ জুলাই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

শামসুজ্জোহাকে উল্লেখ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন:

‘স্যার। (মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা), এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার। আপনার সমসাময়িক সময়ে যারা ছিল সবাই তো মরে গিয়েছে। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত আপনারাও প্রকৃতির নিয়মে একসময় মারা যাবেন। কিন্তু যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন। ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানান, রাস্তায় নামুন, শিক্ষার্থীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। প্রকৃত সম্মান এবং শ্রদ্ধা পাবেন। মৃত্যুর সাথে সাথেই কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন না। আজন্ম বেঁচে থাকবেন শামসুজ্জোহা হয়ে। অন্তত একজন ‘শামসুজ্জোহা” হয়ে মরে যাওয়াটা অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানের আর গর্বের। আর যতদিন বেঁচে আছেন মেরুদণ্ড নিয়ে বাঁচুন।’

কোটা আন্দোলনকারীরা তাকে আন্দোলনের প্রথম শহিদ হিসেবে আখ্যায়িত করে। আবু সাঈদের মৃত্যুর পরদিন ১৭ জুলাই তাজহাট থানার উপপরিদর্শক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় তাজহাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে আবু সাঈদের মৃত্যুর দায় বিক্ষোভকারীদের ওপর চাপানো হয়। মামলার তথ্য বিবরণী পুলিশ উল্লেখ করে এভাবে, “বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীদের ছোড়া গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের এক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সহপাঠীরা ধরাধরি করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’ এই মিথ্যা তারা ধামা-চাপা দিতে পারেনি। কারণ গণমাধ্যমে বিষয়টি সরাসরি সম্প্রচারিত সম্প্রচারিত হচ্ছিল। পুলিশ মামলা দায়ের করে, যার দরুন তারা আবু সাঈদের লাশটি ছাত্র-ছাত্রীদের মর্গে পৌঁছানোর পূর্বেই নিয়ে যায় এবং পোষ্ট-মর্টেম করে ফেলে। অবশেষে তাকে নিজ বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জে চিরতরে সমাহিত করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ফারুক ফয়সাল আবু সাঈদের মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ছেলেটার কাছে যেহেতু প্রাণঘাতী কোনও অস্ত্র ছিল না, কাজেই পুলিশের সহিংস হওয়ার কোনও দরকার ছিল না, কিন্তু পুলিশ সেটি না করে গুলি ছুড়লো। নিরীহ মানুষের উপর এমন আক্রমণ মোটেও মেনে নেওয়া যায় না।”

আবু সাঈদের মৃত্যুতে গোটা দেশ শোকাহত হয়। তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান যুবক, একজন সাহসী নেতা। তার মৃত্যু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। আবু সাঈদের আত্মদান সারা দেশে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে নতুন এক প্রেরণা জাগিয়ে তুলেছিল। কবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী আবু সাইদের নামে একটা কবিতা লিখেন। তার নাম দেন ‘প্রজন্মের বীর আবু সাঈদ’। আন্দোলনকারীরা রংপুর পার্ক মোড়ের নাম করে ‘আবু সাঈদ চত্বর’ দিয়েছেন। সেই সাথে শিক্ষার্থীরা রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলগেটের নাম ‘শহীদ আবু সাঈদ গেইট’ নামকরণ করেন।