logo

কলাম

শোকের আবহে গাজাবাসীর ঈদ পালন

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এখনো চলছে। যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে গেছে গাজা উপত্যকায় চলমান পরিস্থিতির কথা। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।

Printed Edition

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলী হামলার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এখনো চলছে। যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে গেছে গাজা উপত্যকায় চলমান পরিস্থিতির কথা। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে। তাদের কথা মনে করার মতো যেন কেউ নেই। গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো মানছে না ইসরাইল। এ শর্ত অমান্য করে গত কয়েক দিনে ইসরাইলী বিমান ও ড্রোন হামলায় গাজা সিটি এবং খান ইউনুসে শিশু ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ বহু ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও এখনো সেখানে নিয়মিত কামানের গোলা ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, এ মাসের গোড়ার দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে অন্তত ২০ জন ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলী হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ২৬৩ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৪ জন। এত বিপুল প্রাণহানির পরও ইসরাইলী হায়েনার দল এখনো বেপরোয়া। বিশ্ব মোড়লরা এ ব্যাপারে নিরব।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতির পর থেকে শত শত মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে বহু লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, এখনও হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আবার ফিরি ঈদ প্রসঙ্গে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের ধর্মীয় আচার ও সামাজিক রীতি বজায় থাকলেও সেখানে আনন্দের জায়গা দখল করেছে শোক ও বেদনা। নামাজ, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাওয়া, শিশুদের উপহার দেওয়া-সব কিছুই হয়েছে, কিন্তু উৎসবের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস ছিল না। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে তারা দেখেছেন প্রায় প্রতিটি পরিবারই যুদ্ধের কারণে প্রিয়জন হারিয়েছে। কোথাও সন্তান, কোথাও স্বামী বা স্ত্রী, আবার কোথাও পুরো পরিবার হারানোর ঘটনা ঘটেছে। অনেক পরিবার এখন ভাড়া বাড়ি বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে। এ অবস্থায় ঈদের সাক্ষাৎগুলো আনন্দের চেয়ে শোক ভাগাভাগির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মানুষ একে অপরের কাছে যাচ্ছে শুধু শুভেচ্ছা জানাতে নয়, বরং হারানো স্বজনদের স্মরণ করতে এবং শোকাহতদের পাশে দাঁড়াতে। স্থানীয়দের ভাষায়, এবারের ঈদ আনন্দের নয়, বরং ক্ষতি, বেদনা ও টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ফিলিস্তিনীদের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরাইলী বাহিনী। ফলে শত শত মুসল্লি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে প্রবেশদ্বার ও আশপাশের সড়কে ঈদের নামাজ আদায় করেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়, দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের বিভিন্ন প্রবেশপথ বিশেষ করে দামাস্কাস গেটসহ এলাকায় বিপুলসংখ্যক মুসল্লি জড়ো হন। তবে ইসরাইলী নিরাপত্তা বাহিনী মসজিদে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দিলে তারা বাইরে ঈদের জামাত আদায় করতে বাধ্য হন। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জেরুজালেম গভর্নরেট। তারা এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনী বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে জানানো হয়, এমন পদক্ষেপের লক্ষ্য আল-আকসাকে তার ইসলামি ও ফিলিস্তিনী পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টানা ২১ দিন ধরে আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।

গাজায় কমেছে ত্রাণ : এদিকে গাজা উপত্যকায় ত্রাণ প্রবেশের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করছে যে, গাজার হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানির দামে নতুন করে বৃদ্ধির আভাস দেখা দিয়েছে। যা সংকটকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছে।

শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ইসরাইলী সেনাদের বিরুদ্ধে। গাজার মধ্যাঞ্চলে এক বছরের একটি শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলী সেনাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্র জানায়, শিশুটির বাবার কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেনারা শিশুটির শরীরে সিগারেটের আগুন দিয়ে পোড়ায় এবং ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করে। পরে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে শিশুটিকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হলেও তার বাবা এখনও আটক রয়েছেন। চিকিৎসা প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী দফায় গাজা পুনর্গঠনের কথাও উল্লেখ ছিল। গত ২৩ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে গাজাকে নতুন করে গড়ে তোলার একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিকল্পনার নাম দেয়া হয়েছে ‘নিউ গাজা’। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডটিকে একেবারে নতুনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে এতে। ‘নিউ গাজা’ নিয়ে উপস্থাপিত স্লাইডে দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরের তীরজুড়ে সারি সারি উঁচু ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাফাহ এলাকায় থাকবে আবাসিক প্রকল্প। একটি মানচিত্রে দেখানো হয়, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষের জন্য ধাপে ধাপে নতুন আবাসিক এলাকা, কৃষিজমি ও শিল্পাঞ্চল তৈরি করা হবে। এদিকে “গাজার নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনী প্রশাসন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) গাজার নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় হামাসের সঙ্গে কাজ করবে, যাতে চুক্তিতে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করে পরের ধাপে নেয়া যায়। তার কিছুই এখন দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে হামাসের অস্ত্র পরিত্যাগের বিষয়েও অগ্রগতি হয়নি। হামাস বরাবরই জানিয়ে এসেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা অস্ত্র ত্যাগ করবে না।

রাফাহ সীমান্তেও ফেরেনি স্বাভাবিক অবস্থা : মিশরের সঙ্গে সংযোগকারী রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় ফেরার সময় এক ফিলিস্তিনীকে আটক করেছে ইসরাইলী বাহিনী। এটি সীমান্ত পুনরায় খোলার পর প্রথম এমন ঘটনা। খবর আনাদোলু এজেন্সির। স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর অনেক যাত্রীকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও কেউ কেউ আটকের মুখে পড়ছেন। এতে চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে চাওয়া অসংখ্য রোগী ও আহত মানুষের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পশ্চিম তীরেও অশান্তি বিরাজ করছে। ইসরাইলী বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন নিত্যকার ঘটনা। অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনী গ্রামে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ঘরবাড়ি, যানবাহন ও কৃষিজমিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গত শনিবার ১৮ বছর বয়সী এক বসতি স্থাপনকারী যুবক ইয়েহুদা শারম্যানের মৃত্যুর পর এই সহিংসতা শুরু হয়। তিনি কোয়াড বাইকে থাকা অবস্থায় একটি গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন বলে জানা গেছে, এবং গাড়িটি এক ফিলিস্তিনী চালাচ্ছিল। ইসরাইলী পুলিশ বলেছে, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় বসতি স্থাপনকারীদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ‘প্রতিশোধ অভিযান’-এর ডাক দেয়া হয়। ইসরাইলী সংবাদমাধ্যমের বরাতে একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাতারাতি ২০টিরও বেশি বসতি স্থাপনকারী হামলার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার পর থেকেই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন। ইসরাইলী প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, শনিবার রাতে বিভিন্ন ফিলিস্তিনী গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলার খবর পেয়ে তাদের সেনা ও সীমান্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। জালুদ, কারিউত, আল-ফান্দুকুমিয়া এবং সিলাত আদ-ধাহ গ্রামগুলো হামলার শিকার হয়। ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এতে ‘বাড়িঘর ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেয়া, বেসামরিক নাগরিকদের আতঙ্কিত ও হত্যা করা এবং ঈদুল ফিতরের সময় গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে হামলা চালানো হয়েছে।’

ফিলিস্তিনীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইসরাইলী মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েশ দিন’ এ হামলাকে ‘পোগ্রম বা হত্যাযজ্ঞের রাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানায়, ‘হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনী যথাযথ প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই হত্যাযজ্ঞ রুখতে কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

চলতি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য ইসরাইলকে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেড়ে গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত বসতি স্থাপনকারীদের হাতে সাতজন ফিলিস্তিনী এবং ইসরাইলী বাহিনীর হাতে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর। এছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীরের একমাত্র খ্রিস্টান অধ্যুষিত শহরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও জমি দখল বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তাদের কৃষিজমি দখল, বাড়িঘরে হামলা এবং চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এসব চাপের কারণে তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হতে পারে। তবে বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের ভূমি ছাড়বেন না এবং টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাবেন।

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনীদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় জড়িত ইসরাইলী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জার্মানি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, তারা এ ধরনের পদক্ষেপ সমর্থন করে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় জোটে নেয়া হবে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও মুসলমানদের ঈদ পালন এবার ততটা আনন্দ বয়ে আনতে পারেনি। বিশ্বব্যাপী নানা অসন্তোষ ও মূল্যবৃদ্ধি এ উৎসবকে কিছুটা হলেও নিরানন্দ ও ম্লান করে দিয়েছে। কারণ বিশ্ব মুসলিম এক সুতোয় বাঁধা। এ বন্ধন আগামীতে দৃঢ় হবে এই আশা সবার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক