logo

কলাম

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ইরানের সাফল্যগাঁথা

ইরান সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের এক বিস্ময় হয়ে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয়েছে। গতবছর ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এবার যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইসরাইল-আমেরিকা উভয় পরাশক্তির সাথে দু’মাসের কাছাকাছি সময় যেভাবে ইরান যুদ্ধ করেছে তাতে

Printed Edition

ইরান সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের এক বিস্ময় হয়ে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয়েছে। গতবছর ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং এবার যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগ পর্যন্ত ইসরাইল-আমেরিকা উভয় পরাশক্তির সাথে দু’মাসের কাছাকাছি সময় যেভাবে ইরান যুদ্ধ করেছে তাতে বিস্মিত না হওয়ার কারণ নেই। আমেরিকার সামনে অন্য অনেক দেশ অল্প সময়ের মধ্যে ধরাশায়ী হলেও ইরান এখনো পর্যন্ত নমনীয় হচ্ছে না। বরং তারা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে। এর বড় কারণ হলো, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও ছেড়ে কথা বলছে না। আর তাদের এ অর্জিত সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের দীর্ঘ গবেষণা। দশকের পর দশক পশ্চিমা অবরোধের মুখে থেকেও ইরান তাদের সামরিক ও প্রযুক্তিখাতে এতটা অগ্রগতি কীভাবে অর্জন করলো তা সত্যিই চিন্তা জাগায়। ইরান নিয়ে ইতিবাচক কথা বললে অনেকের মধ্যে আবার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। অথচ আমাদের নিজেদের স্বার্থেই ইরানের এই অগ্রগতিগুলো নিয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ছিল। আমরা কেন একই ধরনের মোটিভেশন ও দৃঢ়তা নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছি না; উল্টো বিভক্তি আর বিভাজনের ফাঁদে পড়ে ক্রমাগত বিপর্যস্ত হচ্ছি- সেই কারণ অনুসন্ধান করাও জরুরি ছিল।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ইরানের রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ এক দীর্ঘ ইতিহাস, যার সূচনা প্রাচীন যুগে, যখন আল-খওয়ারিজমি ও ইবনে সিনার মতো মনীষীরা আধুনিক গণিত ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। বীজগণিতের বিকাশ থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতি এবং জ্ঞানের এ শাখাগুলোতে ইরানের অবদান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডারকে প্রভাবিত করেছে। আজও, নানা আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, ইরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও ন্যানোপ্রযুক্তির মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে নেতৃত্বের অবস্থানে উঠে আসছে। প্রাচীন উদ্ভাবন থেকে আধুনিক সাফল্যের এ দীর্ঘ যাত্রা ইরানের স্থায়ী ঐতিহ্য এবং বৈশ্বিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রভাগে থাকার উচ্চাকাক্সক্ষাকেই তুলে ধরে।

ইতিহাসজুড়ে ইরানি বিজ্ঞানীদের অবদান এত বিস্তৃত যে তা একটি নিবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আল-খওয়ারিজমি ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভা; তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়। তার নাম থেকেই ইংরেজি ‘algorithm’ শব্দটির উৎপত্তি। খ্রিষ্টাব্দ ১০০০ সালে আল-বিরুনি একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্বকোষ রচনা করেন, যেখানে তিনি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে পারেÑএমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। টাইখো ব্রাহের আকাশের মানচিত্র তৈরি করার আগেই এটি তৈরি করা হয়েছিল। আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ইরানের প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র গুণ্ডেশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে, যা তৃতীয় শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবনে সিনার রচিত কানুন ফিৎ তিব্ব (Canon of Medicine), ১০২৫ সালে রচিত একটি চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্বকোষ, যা ইউরোপে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

গত ৪৫ বছরে গবেষণার প্রায় সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইরান শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইরানি বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইরানের বিজ্ঞান ও উন্নয়ন সম্পর্কে প্রায়ই নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হয় যা এবারের যুদ্ধে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে ইরান বহু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ফলাফল দেখলেই বোঝা যায় যে ইরানিরা বিশ্বমঞ্চে সাফল্য অর্জন করছে। ২০২৪ সালের বৈজ্ঞানিক অলিম্পিয়াডগুলোতে ইরান পাঁচটি অলিম্পিয়াডে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ইরানি শিক্ষার্থীরা প্রথম স্থান অধিকার করে। ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে ইরান ৯৬টি দেশের মধ্যে ৯ম স্থান অর্জন করে। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে ইরানি দল একটি রৌপ্য ও তিনটি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে।

বিজ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইরান ২০২১ সালে ১৫তম স্থানে ছিল। মহাকাশ প্রযুক্তিতে ১৩তম, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৫তম এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ক্ষেত্রে ৭ম স্থানে রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইরান নিজস্ব টিকা উৎপাদনে সক্ষম ১০টি দেশের মধ্যে একটি ছিল। দেশে প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। ন্যানোমেডিসিন উৎপাদনে ইরান বিশ্বে ৭ম স্থানে রয়েছে। উচ্চক্ষমতার লেজার প্রযুক্তি উৎপাদনে শীর্ষ ৫ দেশের একটি। বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিশ্বে ৪র্থ এবং চক্ষুবিজ্ঞানে ১৫তম স্থানে রয়েছে। হৃদরোগ ও হৃদযন্ত্রের ভালভ সার্জারিতে ইরানি সার্জনরা বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। রোবোটিক্সে ইরান ৪র্থ স্থানে এবং সামুদ্রিক শিল্পে ১৩তম স্থানে রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞান বৃদ্ধির হারে বিশ্ব গড়ের তুলনায় ১১ গুণ দ্রুত অগ্রগতির মাধ্যমে ইরান দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

ইরান এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (আর্টিফিশিয়াল টেকনোলোজি বা এআই) শাসনব্যবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই তারিখে জাতীয় এআই কৌশল দলিল গ্রহণ এবং জাতীয় এআই সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো, ২০৩৪ সালের মধ্যে শাসন ব্যবস্থা, ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে এআই ব্যবহারে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে স্থান অর্জন করা। এ কৌশলে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ইরানকে একটি স্মার্ট রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশটির সপ্তম উন্নয়ন পরিকল্পনার ১০৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র ডিজিটালাইজেশন যথেষ্ট নয়; প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে।

ইরান নতুন করে একটি ন্যাশনাল এআই ইন্সটিটিউটও করেছে যার দায়িত্ব হলো উদ্ভাবন ত্বরান্বিত করা, বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং এআই উদ্যোগসমূহকে এগিয়ে নেওয়া। সংস্থাটি একটি বৃহৎ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে যার উদ্দেশ্য হলো ডেটা অবকাঠামো গড়ে তোলা, বড় পরিসরের সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং সরকারি ব্যবহারের জন্য কার্যকর এআই তথ্যভান্ডার তৈরি করা। এটি ইরানের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা, যার মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক এআই গবেষণা ও প্রয়োগে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে চায়।

এখানে বলা দরকার যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে যন্ত্র মানুষের মতো চিন্তা, শেখা, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীল কাজ করতে সক্ষম হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই বিশ্বকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করবে। একটি প্রতিবেদনের মতে, এআই ক্ষেত্রে ইরান বিশ্বে ৩৩তম স্থানে রয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে এআই গবেষণায় ইরান শীর্ষ দেশগুলোর একটি। গত দুই দশকে এআই গবেষণায় ইরানের অবদান এ স্বীকৃতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি র‌্যাংকিং অনুযায়ী, এআই-এর বিভিন্ন উপক্ষেত্রে (সাবফিল্ডে) ইরান বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছে। এর মধ্যে নিউরাল নেটওয়ার্কে ইরানের অবস্থান ৬ষ্ঠ আর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে প্রথম। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে ১৬ আর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। কম্পিউটার ভিশনে চতুর্থ। ম্যাশিন লার্নিংয়ে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। রোবোটিকস এবং মাল্টি এজেন্ট লার্নিংয়েও বিশ্বের শীর্ষ ১০ এর মধ্যে রয়েছে ইরান আর বলাই বাহুল্য এ দুটো খাতেও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইরান সবচেয়ে এগিয়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক উৎপাদনে ইরানের প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হুমকি ও ভীতি এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা কখনোই দেশটির নিজস্ব বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। ইসলামী বিপ্লবের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। যে সব সম্মানের শিখর একসময় কেবলমাত্র কিছু উন্নত দেশের একচেটিয়া দখলে ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই ইরানের মেধাবী তরুণদের দ্বারা অর্জিত হয়েছে। যেসব দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হয়েছে, পশ্চিমারা সাধারণত এসব জ্ঞান নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় এবং স্বাধীন দেশগুলোকে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। ইরানকেও প্রতিনিয়ত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

কানাডার মন্ট্রিয়লভিত্তিক ডাটা-বিশ্লেষণ সংস্থা সায়েন্স-মেট্রিক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর ইরানে বৈজ্ঞানিক উৎপাদন বিশ্ব গড়ের তুলনায় ১১ গুণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। অন্যদিকে, ওয়েব অব সায়েন্স ডাটাবেজে তালিকাভুক্ত বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যার ওপর করা এক জরিপে দেখা যায়, পশ্চিম এশিয়ায়Ñবিশেষত তুরস্ক ও ইরানেÑএ প্রবৃদ্ধির হার বিশ্ব গড়ের প্রায় চার গুণ বেশি। ইরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) অবকাঠামোয় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে, যার মধ্যে “সিমোরঘ” সুপারকম্পিউটার এবং MHQSDC (ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ডাটা সেন্টার) অন্তর্ভুক্ত। এসব উদ্যোগ দেশের অভ্যন্তরীণ এআই সক্ষমতা বৃদ্ধি করার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে, যা বেসামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তাÑউভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। এআই প্রযুক্তি সামরিক ও নজরদারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যেমন মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি) এবং সাইবার নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্মে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের শাহেদ নামের কেমিকেইজ ড্রোন এবং ক্লাস্টার ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা পাল্টে দেয়ার বার্তা দিচ্ছে।

ইরানের অভ্যন্তরে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও রোবোটিক্সে গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে। এর ফলে এমন একটি মিশ্র পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে জাতীয় গবেষণা ও বিদেশি প্রযুক্তি আহরণ একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। ইরান পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় এবং কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রায় ৭০ ধরনের রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। ইরান উন্নত সেন্ট্রিফিউজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ২০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সিলিসাইড জ্বালানি উৎপাদনের দিকে এগিয়েছে, যা গবেষণা রিয়্যাক্টরের জন্য জ্বালানি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দেশটি তার পারমাণবিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানভিত্তি সম্প্রসারণ করছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদ্বেগেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এর বাইরে ন্যানোপ্রযুক্তিতে ইরান বৈশ্বিকভাবে একটি শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃত এবং এ ক্ষেত্রে প্রকাশনার সংখ্যায় বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। পাশাপাশি, ইরান নিজস্বভাবে নির্মিত রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করেছে। জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি, স্টার্টআপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পের দ্রুত বৃদ্ধি এ অগ্রগতির বড় একটি অংশকে চালিত করছে। পশ্চিমা প্রযুক্তিগত একচেটিয়াত্ব ভাঙার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইরানের এতসব অগ্রগতির নেপথ্যে মূল মোটিভেশন হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক ও সামরিক খাতে এ প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে ইরানি নেতৃত্ব সবসময়ই গুরুত্ব দেন কেননা তাদের কাছে এই বিষয়গুলো জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের একটি উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরেকটি প্রসঙ্গ আমি বিশেষভাবে এ লেখায় উল্লেখ করতে চাই যা থেকেও আমাদের বর্তমান অবস্থান মুল্যায়ন করার সুযোগ আছে। আর তাহলো শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিক্ষেত্রে ইরানের নারীদের অবিশ্বাস্য অগ্রগতি। ইরানি নারীরা শিক্ষা ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বর্তমানে নারীদের সাক্ষরতার হার ৯৬ শতাংশেরও বেশি, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে নারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী-এ ক্ষেত্রগুলোর স্নাতকদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানিগুলোর বোর্ড সদস্যদের প্রায় ১৯ শতাংশ নারী। ১৯৭০-এর দশকে বিপ্লবের আগে ইরানের নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৩৫.৫ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৯৬ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। তরুণীদের সাক্ষরতার হার এখন ৯৮ শতাংশ অতিক্রম করেছে। ইরানে মোট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। নারীরা অধ্যাপক, গবেষক ও ডিন হিসেবে একাডেমিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আমরা যদি নিজেদের মতো করে স্বাবলম্বী হতে চাই কিংবা আমাদের দেশের দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তারা তাকাতে চায় তাদের মোকাবেলা করতে চাই তাহলে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামরিকখাতে ইরানের এ অসামান্য অগ্রগতিকে নিয়ে আরো বিস্তারিত পরিসরে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।