logo

বাংলার ভূমিপুত্রদের আজাদীর লড়াই ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বাঁক বদলগুলো কখনো হুট করে আকাশ থেকে পড়ে না। কোনো একটি বিশেষ দিন, কোনো একটি বিশেষ মাসের তীব্র গণবিস্ফোরণ আসলে শত শত বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ,

মুহাম্মদ নূরে আলম
Printed Edition

মুহাম্মদ নূরে আলম

কূটনৈতিক রিপোর্টার

দৈনিক সংগ্রাম

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বাঁক বদলগুলো কখনো হুট করে আকাশ থেকে পড়ে না। কোনো একটি বিশেষ দিন, কোনো একটি বিশেষ মাসের তীব্র গণবিস্ফোরণ আসলে শত শত বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রতিরোধ এবং মুক্তির আকাক্সক্ষারই এক একটি আধুনিক সংস্করণ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের শুরুতে এদেশের ছাত্র-জনতা যে ঐতিহাসিক সফল গণঅভ্যুত্থান প্রত্যক্ষ করল; যাকে রাজনৈতিক ভাষায় ‘৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে অবিহিত করা হচ্ছে; তা এই ভূখ-ের হাজার বছরের স্বাধীনচেতা মানুষের দীর্ঘ আজাদী লড়াইয়ের এক অনিবার্য ধারাবাহিকতা মাত্র। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে আমি যখন এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রাম পর্যবেক্ষণ করেছি, তখন একটি সত্য বারবার উন্মোচিত হয়েছে; বাংলার মানুষ সাময়িকভাবে মাথা নত করলেও, তাদের ভেতরে আজাদীর যে আগুন জ্বলছে, তা কখনো নেভানো যায় না। এই ভূখ-ের ভূমিপুত্ররা আজীবন লড়াই করেছে তাদের মর্যাদা ও স্বাধিকারের জন্য। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের মূলধারার ইতিহাসচর্চায় এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের বহুমাত্রিক রূপটিকে আড়াল করা হয়েছে।

আমাদের ইতিহাসকে শুধু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার ফ্রেমে বন্দী করে ফেলার একধরনের রাজনৈতিক অপচেষ্টা আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি। এই অপচেষ্টায় যে বাম ও সেকুলার গোষ্ঠী এবং কালকাতা কেন্দ্রীক হিন্দু বাহ্মণ্যবাদের এদেশীয় নর্দমার কীটরা জড়িত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাষা আন্দোলন কিংবা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় চেতনার একেকটি মহান মাইলফলক। কিন্তু আমাদের ইতিহাস কেবল এখান থেকেই শুরু হয় না। তারও আগে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে বসবাসকারী আপামর মানুষের, বিশেষ করে বাংলার মুসলিম ও গ্রামীণ সমাজের হাজার বছরের সংগ্রাম, বিদ্রোহ ও আত্মত্যাগের এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। এই বিস্তৃত ইতিহাসকে যদি আমরা বর্তমানের ‘জেন-জি’ (এবহ-ত) অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে না পারি, তবে জাতি হিসেবে আমাদের ঐতিহাসিক শিকড় দুর্বল হয়ে পড়বে। আর শিকড়হীন জাতি সহজেই যেকোনো বহিরাগত আধিপত্যবাদের শিকারে পরিণত হয়। এই প্রবন্ধে আমরা গভীর ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করব কীভাবে বাংলার ভূমিপুত্ররা; বিশেষ করে আলেম-উলামারা হাজার বছর ধরে শাসক গোষ্ঠীর শ্রেণি বৈষম্য বা দ্বৈত শোষণের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়েছেন এবং কীভাবে সেই ধারাবাহিকতা ২০২৪ সালের ৩৬শে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

এক. বাংলার ভূমিপুত্র আলেম-উলামারা এই দ্বৈত শোষণের বিরুদ্ধে শুধু ধর্মীয় সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তারা মানুষের মনে এই রাজনৈতিক বোধ তৈরি করেছিলেন; যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো দাসত্ব করা যাবে না। ফলে, ধর্মীয় আজাদী এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা এখানে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমরা যদি আজ যেকোনো প্রকার নব্য-আধিপত্যবাদ বা বহিরাগত প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চাই, তবে আমাদের এই ‘ডাবল কলোনি’র ইতিহাসকে পুনরাবিষ্কার করতে হবে। ভারতীয় বা অন্য যেকোনো গোলামী থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা এবং হিন্দু জমিদারি নিপীড়নের সেই রক্তঝরা ইতিহাসকে অন্তরে ধারণ করা। বাংলার হাজার বছরের আজাদী সংগ্রাম, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং স্বাধিকার আন্দোলনে যে সমস্ত আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখগণ নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা অনন্য অবদান রেখেছেন তারা হলেন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রধান নেতা, সুফি সাধক ও প্রাজ্ঞ আলেম শাহ সুলতান হাসান আলী মজনু শাহ (মজনু শাহ) এবং মুসা শাহ মজনু শাহের ভাই, চেরাগ আলী শাহ। মাদার বখশ হলেন উত্তর ও পূর্ব বঙ্গে ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অন্যতম ফকির নেতা। সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ঐতিহাসিক ‘বাঁশের কেল্লা’র প্রতিষ্ঠাতা। গোলাম মাসুম তিতুমীরের প্রধান সেনাপতি। হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজি আন্দোলনের প্রবক্তা। মোহাম্মদ মহসীনউদ্দীন আহমদ (দুদু মিয়া) হাজী শরীয়তুল্লাহর সুযোগ্য পুত্র। সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদ বালাকোট আন্দোলনের মূল ইমাম ও সিপাহসালার। মাওলানা বেলায়েত আলী ও মাওলানা এনায়েত আলী (পাটনা/বাংলা) আজাদী লড়াই জারি রেখেছিলেন বালাকোটের বিপর্যয়ের পর। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান এবং মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি ব্রিটিশ বিরোধী রেশমি রুমাল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিপ্লবী ও আলেম।

আল্লামা ফজলুল হক খায়রাবাদী, মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গোহী, মাওলানা কাসেম নানুতবী এবং হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঐতিহাসিক ফতোয়া প্রদানকারী ও লড়াইকারী বীর আলেমগণ। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক, প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রথম সারির নেতা। মাওলানা শওকত আলী ও মাওলানা মোহাম্মদ আলী (আলী ভ্রাতৃদ্বয়) ব্রিটিশ বিরোধী বিখ্যাত ‘খিলাফত আন্দোলন’-এর পুরোধা ব্যক্তিত্ব। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শীর্ষ কংগ্রেস নেতা। মাওলানা আতাহার আলী নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সিলেট গণভোটসহ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী। শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী মুসলিম লীগের অন্যতম সমর্থক আলেম। মুফতি শফি উসমানী পাকিস্তান ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী ফকিহ। মাওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গের অন্যতম সক্রিয় আলেম নেতা। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা। মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (ছদর সাহেব) ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও আলেম।

দুই. ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০): আজাদী সংগ্রামের দশটি ঐতিহাসিক মাইলফলক ও আলেম-উলামাদের অবদান ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১৭৬০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলার বুকে যে সমস্ত প্রধান প্রধান আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিটিতে এদেশের উলামা সমাজ ও সাধারণ তৌহিদী জনতা কীভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং রক্ত দিয়েছিলেন, তা আমাদের গভীরভাবে জানা প্রয়োজন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব-শোষণ ও ইজারাদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে পূর্ব ও উত্তরবঙ্গে যে প্রথম সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, তা-ই সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ নামে পরিচিত। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চলা এই বিদ্রোহে মুসলমান ফকির এবং মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষিজীবী মানুষ একযোগে অংশ নেন। পলাশীর বিপর্যয়ের পর যখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে এবং ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে, তখন বাংলার শোষিত মানুষের পক্ষে প্রথম তলোয়ার তুলে ধরেন মজনু শাহ, যা ইতিহাসে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০) নামে পরিচিত। তাঁরা মানুষকে বুঝিয়েছিলেন যে, বিদেশী কাফেরদের শাসন মেনে নেওয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। এই আন্দোলন বাংলার মানুষের মনে প্রথম আজাদী সংগ্রামের বীজ বপন করেছিল এবং বহু আলেম এই লড়াইয়ে শহীদ হন। এই অন্দোলন ছিল ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন মুসলিম ফকির মজনু শাহ। ফকিরদের নেতা শাহ সুলতান হাসান আলী মজনু শাহ (মজনু শাহ) ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ আলেম ও সুফি সাধক। তাঁর নেতৃত্বে হাজার হাজার ফকির ও কৃষক ব্রিটিশদের কুঠি আক্রমণ করে এবং তাদের খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেয়। মজনু শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ এবং মাদার বখশ এই লড়াই চালিয়ে যান।

তিন. তিতুমীরের আন্দোলন (১৮৩১): জমিদারদের অত্যাচার এবং ব্রিটিশদের নীল চাষের বিরুদ্ধে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার লড়াই এদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ছিলেন মক্কার প্রখ্যাত উলামাদের কাছ থেকে দীক্ষিত একজন উচ্চশিক্ষিত আলেম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি যখন মক্কা থেকে ফিরে এসে দেখেন যে, স্থানীয় জমিদার কৃষ্ণদেব রায় মুসলমানদের দাড়ি রাখার ওপর কর (দাড়ি কর) ধার্য করেছে এবং মসজিদ ভাঙচুর করছে, তখন তিনি এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিতুমীর চব্বিশ পরগনা ও নদীয়ার মুসলিম কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি নারকেলবাড়িয়ায় তাঁর বিখ্যাত ‘বাঁশের কেল্লা’ নির্মাণ করেন। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশদের আধুনিক কামানের গোলার মুখে তিতুমীর এবং তাঁর প্রধান সেনাপতি গোলাম মাসুমসহ অসংখ্য আলেম ও মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেন। তিতুমীর দেখিয়েছিলেন কীভাবে আলেম সমাজ কৃষকের অধিকার রক্ষায় জীবন দিতে পারে।

চার. ফরায়েজি আন্দোলন (১৮১৮-১৮৬২): বাংলার বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল ও ঢাকা অঞ্চলের মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন ছিল ফরায়েজি আন্দোলন (১৮১৮-১৮৬২)। এই আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। তিনি সুদূর মক্কা থেকে দীর্ঘকাল ইসলামি শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বাংলায় ফিরে আসেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ হচ্ছে ‘দারুল হরব’ বা শত্রুর রাজ্য, যেখানে জুমার নামাজ ও ঈদের নামাজ পড়া জায়েজ নয় যতক্ষণ না দেশ স্বাধীন হচ্ছে। এটি ছিল একটি গভীর রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক অবস্থান। হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য পুত্র মোহাম্মদ মহসীনউদ্দীন আহমদ (দুদু মিয়া) এই আন্দোলনকে আরও বিপ্লবী রূপ দেন। তিনি ঘোষণা করেন, “লাঙল যার, জমি তার” এবং “জমির মালিক আল্লাহ, তাই আল্লাহর জমিতে কর আদায় করার অধিকার কোনো জমিদারের নেই।” তিনি শোষক জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। দুদু মিয়া ও তাঁর অনুসারী আলেমদের দীর্ঘ কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়, যা বাংলার গ্রামীণ সমাজে স্বাধিকারের চেতনাকে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল।

পাঁচ. বালাকোট আন্দোলন (১৮৩১): উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ দূর করার জন্য এবং একটি স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদের নেতৃত্বে যে জিহাদ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় রসদ ও মুজাহিদ সরবরাহ করেছিল বাংলার মুসলমানেরা। ১৮৩১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বালাকোট ময়দানে সৈয়দ আহমদ বেরলভী এবং শাহ ইসমাইল শহীদ শিখ ও ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হন। কিন্তু এই আন্দোলনের আসল প্রাণশক্তি টিকিয়ে রেখেছিলেন বাংলার আলেম ও সাধারণ মানুষ। বাংলার প্রখ্যাত আলেম মাওলানা বেলায়েত আলী এবং মাওলানা এনায়েত আলী (পাটনার সাদেকপুর পরিবার, যাদের শিকড় ও কর্মক্ষেত্র বাংলায় বিস্তৃত ছিল) এই আন্দোলনকে দশকের পর দশক ধরে বাঁচিয়ে রাখেন। বাংলার হাজার হাজার তরুণ আলেম ঘরবাড়ি ছেড়ে পায়ে হেঁটে হাজার মাইল দূরের বালাকোট ও সিত্তানার সীমান্ত অঞ্চলে আজাদী লড়াইয়ের জন্য গিয়েছিলেন। বাংলার মানুষের পাঠানো অর্থ ও রক্তে এই আন্দোলন ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

ছয়. নীল বিদ্রোহ (১৮৬০): বাংলার উর্বর জমিতে জোরপূর্বক নীল চাষ করিয়ে কৃষকদের ক্রীতদাসে পরিণত করার বিরুদ্ধে এটি ছিল এক রক্তক্ষয়ী গণবিদ্রোহ। ফরায়েজি আন্দোলনের আলেম ও অনুসারীরা এই বিদ্রোহে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। স্থানীয় ওলামারা নীলকরদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন এবং কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন যে, নিজের জমিতে নীল চাষ না করে ধান চাষ করা তাদের অধিকার ও ধর্মীয় কর্তব্য। আলেমদের এই নৈতিক ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা কৃষকদের মনে ব্রিটিশদের লাঠিয়াল ও বন্দুকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অসীম সাহস জুগিয়েছিল।

সাত. বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): বাংলার পিছিয়ে পড়া, শোষিত ও অবহেলিত পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত মুক্তির জন্য ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। তৎকালীন কলকাতার এলিট শে্িরণ ও জমিদাররা যখন বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করছিল, তখন পূর্ববঙ্গের আলেম সমাজ এর পক্ষে জনমত গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। নওয়াব সলিমুল্লাহ এবং মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর মতো দূরদর্শী আলেম ও নেতৃবৃন্দ ঢাকার আহসান মঞ্জিল থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদে ঘুরে ঘুরে মুসলিম সমাজকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, নিজেদের একটি আলাদা প্রশাসনিক অঞ্চল না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না।

আট. সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭): ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বা সিপাহী বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সামরিক ও বেসামরিক অভ্যুত্থান। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক যার রক্তক্ষয়ী সাক্ষী। এই বিদ্রোহের মূল মন্ত্রণাদাতা ও ঘোষক ছিলেন আলেম-উলামারা। দিল্লীর আল্লামা ফজলুল হক খায়রাবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়েছিলেন। আর বাংলায় এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল ব্যারাকপুর থেকে চট্টগ্রামে ও ঢাকায়। ঢাকার লালবাগ কেল্লায় এবং বাহাদুর শাহ পার্কে যে সমস্ত সিপাহী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছিলেন, তাদের মধ্যে বহুসংখ্যক ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলিম ও উলামা মনস্তত্ত্বের মানুষ। ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহের পর হাজার হাজার আলেমকে ফাঁসি দিয়েছিল এবং আন্দামানে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, কারণ তারা জানত আলেমরাই এই বিদ্রোহের মূল আদর্শিক চালিকাশক্তি।

নয়. ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের এক মহান মাইলফলক। কিন্তু এই আন্দোলনেও আলেমদের অবদানকে ইতিহাস থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের পর থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আলেমদের ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৪৮ সালে গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। এছাড়াও মাওলানা আতাহার আলী (নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আলেমগণ উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির হত্যাকা-ের পর, ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এবং বিভিন্ন মসজিদে যে গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন আলেম-উলামারা। আইনসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথম যারা জোরালো বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে উলামা ও ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ডের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অন্যতম ছিলেন।

দশ. ৩৬শে জুলাই গণঅভ্যুত্থান (২০২৪): হাজার বছরের আজাদী সংগ্রাম কীভাবে ২০২৪-এর ‘৩৬শে জুলাই’ হয়ে উঠল? এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ১৭৬০ সালের ফকির বিদ্রোহ বা ১৮৩১ সালের তিতুমীরের আন্দোলনের সাথে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের তাত্ত্বিক সম্পর্কটা কোথায়? সম্পর্কটা হলো ‘প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব’ (Psychology of Resistance) এবং ‘ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা’। এই প্রতিটি আজাদীর লড়াইয়ের অধ্যায়েই একটি অভিন্ন সুর বেজেছে; অন্যায় শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। এই গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ ছিল না। ৩৬শে জুলাই সেই দীর্ঘ আজাদীর লড়াইয়ের ধারাবাহিকতারই সর্বসাম্প্রতিক অধ্যায়। বাংলার মানুষ যখনই দেখেছে যে তাদের ওপর কোনো স্বৈরাচারী, আধিপত্যবাদী বা কলোনিয়াল কাঠামো চেপে বসছে, তখনই তারা ফুঁসে উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এদেশের জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্ম এবং আপামর জনতা যে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল, তা আসলে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লারই একটি আধুনিক ডিজিটাল সংস্করণ। আবু সাঈদ যখন রংপুরের বুকে দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন সেই দৃশ্যের মধ্যে আমরা ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর নারকেলবাড়িয়ায় ব্রিটিশ কামানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিতুমীরের গোলাম মাসুমের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাই। ইতিহাস শুধু কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা রাষ্ট্রের পরিবর্তনের দলিল নয়; ইতিহাস হলো মানুষের ভেতরের চেতনার বিবর্তন। বাংলার মাটি ও মানুষের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা আছে। এই সত্তাকে যখনই কোনো অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার কিংবা বহিরাগত কোনো শক্তির কাছে বন্ধক দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, তখনই বাংলার ভূমিপুত্ররা তাদের জীবনের বিনিময় হলেও আজাদী ছিনিয়ে এনেছে। ২০২৪ সালের ‘৩৬শে জুলাই’ (৫ই আগস্টের গণবিস্ফোরণকে ছাত্ররা যেভাবে প্রতীকী রূপ দিয়েছে) হলো সেই হাজার বছরের পুঞ্জীভূত আজাদী স্পৃহারই আধুনিক বিস্ফোরণ।

এগারো. আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চায় আলেম-উলামা ও গ্রামীণ মুসলিম সমাজের এই সুবিশাল অবদানকে প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে। এর ফল কী হচ্ছে? এর ফল হচ্ছে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম মনে করছে আমাদের স্বাধীনতা বোধহয় কেবল কয়েক দশকের পুরনো। তারা তাদের হাজার বছরের গৌরবময় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যখন একটি জাতিকে তার আসল ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই জাতির মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। আর এই হীনম্মন্যতার সুযোগ নিয়েই নব্য-আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো আমাদের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে গ্রাস করতে আসে। আমরা যদি আমাদের ইতিহাসচর্চায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের সংগ্রাম, ফরায়েজি আন্দোলন কিংবা বালাকোটের ত্যাগকে যথাযথ গুরুত্ব না দিই, তবে জাতি হিসেবে আমরা বারবার আধিপত্যবাদের মুখে পড়বো। কারণ, ইতিহাস শুধু দিল্লির দরবারের বা কলকাতার বাবুদের ইতিহাস নয়; ইতিহাস হলো এই বাংলার পদ্মা-মেঘনা-যমুনার অববাহিকায় গড়ে ওঠা সাধারণ মানুষের ইতিহাস।

আমাদের বহুমাত্রিক ইতিহাসকে স্মরণ করা কোনো বিলাসীতা নয়, এটি আমাদের বেঁচে থাকার লড়াই। যে জাতি তার বহুমাত্রিক ইতিহাসকে স্মরণ করে, সে জাতি নিজের স্বাধীন চিন্তা ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় রক্ষায় আরও সক্ষম হয়ে ওঠে। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, আমরা আমাদের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ফ্রেমে বন্দী হতে দেব না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতা এবং জমিদারি নিপীড়নের এই দ্বৈত অভিজ্ঞতাকে আমাদের গুরুত্ব সহকারে স্মরণ ও লালন করতে হবে। তবেই আমরা যেকোনো ধরনের আধুনিক আধিপত্যবাদী মানসিকতার সমালোচনা করার তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করব এবং নিজেদের স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করতে পারব। ৩৬শে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে কারণ এদেশের মানুষের রক্তে হাজার বছরের আজাদী সংগ্রামের ডিএনএ মিশে আছে। এই আজাদী রক্ষা করতে হলে তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, মজনু শাহ এবং সৈয়দ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদের উত্তরসূরি হিসেবে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তাদের আসল গৌরবময় ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তবেই চিরতরে মুক্তি মিলবে সব ধরনের গোলামী থেকে।