logo

ফুটবল

হাল্যান্ড ঝড়ে স্তব্ধ সাম্বা ছন্দ

ব্রাজিলকে বিদায় করে নরওয়ের ইতিহাস

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে এক মহানাটকীয় রূপকথার জন্ম দিল নরওয়ে। রোববার রাতে নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে আর্লিং হাল্যান্ডের জোড়া গোলে

কামরুজ্জামান হিরু
Printed Edition
নিউ জার্সিতে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ করলেন আর্লিং হাল্যান্ড
নিউ জার্সিতে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ করলেন আর্লিং হাল্যান্ড

কামরুজ্জামান হিরু

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর মঞ্চে এক মহানাটকীয় রূপকথার জন্ম দিল নরওয়ে। রোববার রাতে নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে আর্লিং হাল্যান্ডের জোড়া গোলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ইউরোপের এই পরাশক্তি। মাঠের ফুটবলে লাতিন সাম্বা ছন্দকে বোকা বানিয়ে শারীরিক শক্তি, গতি আর নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের এক অনন্য প্রদর্শনী দেখিয়েছে নরওয়েজিয়ানরা। একই সঙ্গে ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে এত আগে বিদায় নিয়েছে সেলেসাও শিবির। শেষ ষোলোর ম্যাচে পেনাল্টি থেকে বদলি নামা নেইমারের গোলটি সেলেসাওদের হারের ব্যবধান কমায়। ইতিহাস গড়ার পর বাঁধভাঙা আনন্দে মাতোয়ারা নরওয়ে এখন নতুন চ্যালেঞ্জের অপেক্ষায়। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের প্রতিপক্ষ ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

সেলেসাওদের সামনে এমন এক পরিসংখ্যানগত জটিলতা দাঁড়িয়েছিল, যা তাদের বৈশ্বিক মর্যাদার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। কারণ নরওয়ের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসটা পুরোপুরি তাদের বিপক্ষে। এবারও সেই অমীমাংসিত ধাঁধার সমাধান বের করতে পারেনি কার্লো আনচেলত্তির দল। নরওয়ের সঙ্গে পাঁচবারের দেখায় এটি তাদের তৃতীয় হার, বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয়। এর আগে ১৯৯৮ সালের আসরের গ্রুপ পর্বেও একই ব্যবধানে হেরেছিল তারা। দুই দলের বাকি দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। মাত্র ৩৪ শতাংশ সময় বল পায়ে রাখলেও পাল্টা আক্রমণে গোলমুখে ভীতি ব্রাজিলই বেশি ছড়ায়। কিন্তু ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা ডুবিয়েছে তাদের। বিপরীতে, বলের দখল রেখে খেলা নরওয়ে অল্প সংখ্যক সুযোগ পেলেও তা দারুণভাবে কাজে লাগান হাল্যান্ড। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে ৭ গোল নিয়ে যৌথভাবে এবারের আসরের গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে উঠলেন তিনি।

ম্যাচে থিতু হওয়ার আগে তৃতীয় মিনিটেই ব্রাজিলের জালে বল পাঠান প্যাট্রিক বার্গ। তবে নরওয়ের এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ স্থায়ী হয় কিছুক্ষণ মাত্র। বার্গকে পাস দেওয়া আলেক্সান্ডার সরলথ অফসাইডে থাকায় বাতিল হয় গোলটি। ব্রাজিলের সামনে লিড নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আসে ডি-বক্সে মাথেউস কুনিয়াকে ক্রিস্টোফার আইয়ের ফেলে দিলে। শুরুতে আবেদনে সাড়া না দিলেও পরে ভিএআরের সাহায্য নিয়ে পেনাল্টি দেন রেফারি। তবে ১৪তম মিনিটে গিমারায়েস স্পট-কিক থেকে হন ব্যর্থ। বামদিকে ঝাঁপিয়ে বল রুখে দিয়ে নরওয়েকে বাঁচান গোলরক্ষক নিলান্ড। রান-আপে কিছুটা থেমে নেওয়া গিমারায়েসের শটে তেমন জোরও ছিল না। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্রাজিল বেঁচে যায় আলিসনের দৃঢ়তায়। ছুটতে থাকা হাল্যান্ডকে আটকাতে মার্কিনিয়োস ও গ্যাব্রিয়েলের চ্যালেঞ্জ করেন একসঙ্গে। আলগা বল চলে যায় ওডেগার্ডের পায়ে। খুব কাছ থেকে তার নেওয়া শট ঝাঁপিয়ে ঠেকান আলিসন।

দ্বিতীয়ার্ধেও নরওয়ে বল দখলে রেখে খেলতে থাকে, ব্রাজিল পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সুযোগ খুঁজতে থাকে। তবে বিরতির পর ব্রাজিল হতাশ করার ধারা জারি রাখলেও হাল্যান্ডের নৈপুণ্যে নরওয়ে ঠিকই গোল আদায় করে নেয়। ৫৯তম মিনিটে ম্যাচের অচলাবস্থা ভেঙে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান আগের মিনিটে কুনিয়ার বদলি নামা এন্দ্রিক। পাল্টা আক্রমণে বাম দিক থেকে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ভিনিসিয়ুস। তখন সামনে কেবলই গোলরক্ষক। প্রথম ছোঁয়াটা ভালো হলেও এন্দ্রিকের দ্বিতীয় ছোঁয়াটা কিছুটা জোরে হয়ে যায়। ততক্ষণে গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা নিলান্ডের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শেষমেশ শট নিলেও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি।

জাপানের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ব্রাজিলের জয়ের নায়ক মার্তিনেলির জায়গায় ৬৭তম মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার। তবে ৩৪ বছর বয়সি অভিজ্ঞ তারকা বদলাতে পারেননি দলের ভাগ্য। নিষ্প্রভ থাকা হাল্যান্ড জ্বলে ওঠেন ৭৯তম মিনিটে। বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরাপ নিখুঁত ক্রস ফেলেন ডি-বক্সের ভেতরে। গ্যাব্রিয়েলকে ফাঁকি দিয়ে লাফিয়ে উঠে হেডে গোল করে নরওয়েকে লিড দেওয়ার পাশাপাশি ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেন হাল্যান্ড।

সমতার খোঁজে থাকা ব্রাজিল ৮৬তম মিনিটে ফের আটকে যায় নিলান্ড নামক বাঁধার দেয়ালে। এন্দ্রিকের শট আইয়েরের পায়ে লেগে ক্রসবার ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল। দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে অসাধারণভাবে বল রুখে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক। এরপর নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে সেলেসাওদের ফেরার সব আশা শেষ করে দেন হাল্যান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বদলি নামা শেলদেরাপের কাছ থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে আচমকা জোরাল নিচু শট নেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়লেও তা ঠেকানোর কোনো উপায় জানা ছিল না আলিসনের।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই নিয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জাল খুঁজে নিলেন হাল্যান্ড। শুধু তাই নয়, চোখ কপালে তোলার মতো বিষয় আছে আরও। নরওয়ের জার্সিতে সবশেষ ১৪টি ম্যাচে ২৭টি গোল করলেন তিনি। যোগ করা আট মিনিট সময়ের শেষদিকে কাসেমিরো ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হন লিও ওস্টিগার্ডের দ্বারা। পেনাল্টি থেকে নিলান্ডকে অবশেষে পরাস্ত করে গোল পাওয়ার হাসি ফুটে ওঠে নেইমারের মুখে। কিন্তু ম্যাচের ফল বদলাতে সেটা যথেষ্ট ছিল না। বরং কিছুক্ষণ পর শেষ বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নেইমারসহ ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা।